
জুবায়ের আল মাহমুদ
একটা সময় ছিল, যখন পোলাপানের রেজাল্ট দেখে নিজেকে খুব অসহায় মনে হতো। এরা পরীক্ষা দিলেই বাংলা প্রথম কিংবা দ্বিতীয় দুটোতেই ১০০-তে ১০০, ইংরেজিতে ১০০-তে ১০০, গণিত, উচ্চতর গণিত, ইতিহাস; সব সাবজেক্টেই ১০০-তে ১০০। তখন ভাবতাম, আমাদের তুলনায় এখনকার পোলাপানরা ছোটবেলায় পুষ্টিকর খাবার বেশি খেয়েছে, তাই হয়তো এরা অনেক মেধাবী।
কিন্তু বাংলা দ্বিতীয়, বাংলা সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্য বা থিওরিটিকাল সাবজেক্টগুলোয় কি আদৌ ১০০-তে ১০০ পাওয়া সম্ভব? বহুবার এ নিয়ে চিন্তা করেছি।
আমাদের সময় স্যারেরা গণিতেও ১০০-তে ১০০ দিতেন না। ৯৫ বা ৯৬ দিতেন, কিন্তু ১০০ কখনোই না। স্যারেরা কোনো জায়গা না পেলেও, জ্যামিতি অংশে ঠিকই নাম্বার কাটতেন।
তবে জাতীয় পর্যায়ে যখন শিক্ষা নিয়ে কাজ করা শুরু করলাম, তখন দেখলাম শিক্ষা সেক্টরটা ব্যবসা সেক্টরে পরিণত হয়েছে, করা হয়েছে রাজনীতিকরণ।
নার্সারি থেকেই শুরু হয় শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা। গ্রামে গ্রামে গজিয়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোয় সর্বপ্রথম শিক্ষিত অভিভাবকরাই তাদের সন্তানদের পড়ানো শুরু করে। এসব স্কুলে পরীক্ষার প্রশ্ন যেমন অতি সহজ করা হয়, তেমনি খাতাও দেখা হয় উদারভাবে। যাই লিখুক, ১০০-তে ১০০। অনেক সময় দেখা যায়, ১০০ না পেলেও ৯৮ বা ৯৯ পেয়েছে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক দুজনই খুশি থাকে, স্কুলেও শিক্ষার্থী বাড়তে থাকে।
শিক্ষা বাণিজ্য ও দুর্নীতি এখান থেকেই শুরু।
অথচ গ্রামগঞ্জে গজিয়ে ওঠা এসব কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা কখনোই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চেয়ে ভালো বা মেধাবী নয়।
একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে রাষ্ট্র প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠদানের উপযোগী করে তৈরি করে, এবং এই শিক্ষা-প্রশিক্ষণ অবসরে যাওয়া পর্যন্ত চলে। তাদের নিয়োগও হয় জটিল ও কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। (এ বিষয়ে অন্য কোনো দিন বিস্তারিত লিখব ইনশাআল্লাহ)
যাই হোক, এবার এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ের কথা বলি। এ পর্যায়ে শিক্ষার মান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের রাজনীতির কারণে।
শিক্ষাবোর্ডগুলো যেকোনো মূল্যে “ফার্স্ট” হতে চায়। সরকারও চায় পাশের হার বাড়াতে। সরকার পাশের হার বাড়িয়ে দেখাতে চায়; তাদের আমলে শিক্ষার অনেক উন্নতি হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
সরকারের এই ইচ্ছাপূরণের জন্য শিক্ষাবোর্ডগুলো খাতা মূল্যায়নকারী শিক্ষকদের বলে দেয়; যারা ৭৬ পাবে, তাদের ৮০ করে দেবেন; ২২ পেলেও ৩৩ করে দেবেন; অঙ্ক অর্ধেক লিখলে, ওই অর্ধেকের জন্যই নাম্বার দেবেন।
অর্ধেক অঙ্ক করে নাম্বার পাওয়া যায়, এটা আমি বাপজন্মেও শুনিনি! অথচ সেটাই হয়েছে বাংলাদেশে। শিক্ষাবোর্ডগুলো পাশের হারে দেশসেরা হওয়ার জন্য শিক্ষকদের বলত, “নাম্বার কি আপনি আপনার পকেট থেকে দিবেন?”
অর্থাৎ বেশি নাম্বার দিলে তো শিক্ষকের কোনো ক্ষতি নেই, তাকে তো এর জন্য পয়সা ব্যয় করতে হবে না; তাহলে কেন তিনি বেশি নাম্বার দেবেন না? অবশ্যই বেশি বেশি নাম্বার দিতে হবে।
দিন শেষে দেখা গেল, এ প্লাসের ছড়াছড়ি। ২০০১ সালে যখন প্রথম গ্রেডিং পদ্ধতি চালু হয়, তখন সারা বাংলাদেশে এ প্লাস পায় মাত্র ৭৬ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু শিক্ষা সেক্টরকে মাথামোটা রাজনীতিবিদরা এতটাই নোংরা করে ফেলল যে, এ প্লাসের সংখ্যা দেড়-দুই লাখে পৌঁছে গেল। পাশের হার এত বেশি করে দেওয়া হলো যে এখন শহর, নগর, গ্রাম; সবখানে দেখা যায় হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার।
ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা, এসবের অধিকাংশ চালক কমপক্ষে এইচএসসি পাস, এমনকি এমএ পাস করা মানুষও এগুলো চালাচ্ছে।
সমাজে ঘুরছে হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার, যারা কাজ পাচ্ছে না। কিন্তু যে ছেলেটি এসএসসিতে ফেল করেছিল; সেই ছেলেটিই বরং বেকার নয়। সে ঠিকই একটা কাজ জোগাড় করে নিয়েছে।
কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে যাদের পাশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, ওরাই এখন সমাজের বোঝা। ওরা না পারছে মাঠের কৃষিকাজে যেতে, না পাচ্ছে চাকরি। সমাজ ইতোমধ্যেই ভারসাম্যহীন হয়ে গেছে।
শুধু তাই নয়, অনার্স পাস করা ছেলেরা এখন সেলসম্যানের চাকরি করছে। তারা এখন চিপস মার্কেটিং করছে। আচ্ছা বলুন তো, মার্কেটিংয়ের চাকরির জন্য কি অনার্স পড়ার প্রয়োজন আছে?
অনার্স পড়া মানে গবেষণাধর্মী পড়া। কিন্তু চরম বাস্তবতা হলো উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে গবেষণা হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের মতো স্যাররা পড়া দেন, আর শিক্ষার্থীরা সেই পড়া মুখস্থ করে এসে স্যারের সামনে উগড়ে দেয়। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র এটাই।
অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র কাজ হলো গবেষণা করা। গবেষণার মাধ্যমেই নতুন কিছু আবিষ্কার হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কিন্তু হচ্ছে তার উল্টো।
কাজেই এবারের এইচএসসির পাশের হারে হোঁচট খাওয়ার কিছু নেই। বরং এর মধ্য দিয়ে আমাদের আসল অবস্থান প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।
যারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে; তাদের পেছনে রাষ্ট্রকে বেশি বিনিয়োগ করা প্রয়োজন।
কর্মমুখী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করুন, যাতে পড়াশোনা শেষ করে কেউ চাকরি না পেলেও অন্তত কিছু একটা করে খেতে পারে। মনে রাখবেন, ফেল করা শিক্ষার্থীরাই শ্রমবাজারে সবার আগে প্রবেশ করে। নামধারী শিক্ষিত লোকের কোনো প্রয়োজন নেই।
লেখক: গণমাধ্যম কর্মী
(লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)