রবিবার ● ৮ নভেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
● সভ্যতার ফেরিওয়ালা      ● জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে এমপি মান্নানের নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য র‍্যালিতে নেতাকর্মীদের ঢল      ● দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্সেস (TWAS)-এর ফেলো নির্বাচিত হলেন বুয়েটের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. আখতার হোসেন      ● শিবপুরে জাতীয় সমবায় দিবস পালিত       ● হলুদ সাংবাদিকতা, অনলাইন জুয়া ও মব ভায়োলেন্স দমনে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত সাতক্ষীরায়      ● চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৫তম জাতীয় সমবায় দিবস পালিত      ● আলীকদমে সাত রোহিঙ্গা আটক      ● বিপুল সংখ্যক ইয়াবা সহ মঠবাড়িয়ার শীর্ষ ২ মাদক কারবারি গ্রেফতার      ● খুলনা অঞ্চলের শাখাসমূহ নিয়ে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের স্ট্র্যাটেজিক কনক্লেভ অনুষ্ঠিত      ● জামালপুরে পৌর আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল: নেতৃত্বে ছানোয়ার হোসেন ছানু      ● উল্লাপাড়ায় ৫৫তম জাতীয় সমবায় দিবস পালিত      ● ভালুকায় ‘শেখ হাসিনা ফিরবেই’ স্লোগানে যুবলীগের মিছিল      
সভ্যতার ফেরিওয়ালা
আব্দুস সোবাহান
প্রকাশ: রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:০০ পিএম
আব্দুস সোবাহান

আব্দুস সোবাহান

​‘ফেরিওয়ালা’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই মনশ্চক্ষুতে ভেসে ওঠে পসরা নিয়ে মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলা এক নিঃসঙ্গ পথিকের দৃশ্য। কিন্তু মানবজাতির রক্তাক্ত ও রুদ্ধশ্বাস ইতিহাসের শুভলগ্নে যে ফেরিওয়ালারা অমানিশার গুহা থেকে মানুষকে প্রথম আলোর মুখোমুখি করেছিলেন, তাঁদের পাথেয় কোনো ক্ষণভঙ্গুর জাগতিক পণ্য ছিল না। তাঁদের ঝুলিতে জমা ছিল প্রজ্ঞা, সাম্য, সৌন্দর্য, ন্যায়বোধ আর মননশীলতার অবিনাশী জ্যোতি। মানুষের ভেতরের হিংস্র বন্যতাকে পরিমার্জিত করে একবিন্দু মানবিকতার চাষ করাই ছিল যুগান্তকারী সেসব চিরন্তন পথিকের একমাত্র ব্রত। ইতিহাসের মহাকাব্যিক ক্যানভাসে তাঁরা অবতীর্ণ হয়েছেন মহাবীর বুদ্ধ, সক্রেটিস, প্লেটো, কিংবা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কালজয়ী আহ্বানে; তাঁদের সুর ধ্বনিত হয়েছে সাহিত্য ও দর্শনের আলোয় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা বিদ্যাসাগরের অনবদ্য সৃষ্টিতে। তাঁরা প্রজ্ঞা ও যুক্তির অলৌকিক দ্যুতিতে মানুষের আত্মাকে ধৌত করেছিলেন—কোনো সামরিক পরাক্রম কিংবা রক্তপাতের মাধ্যমে নয়।

​কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ভূরাজনীতির পঙ্কিল মঞ্চে ‘সভ্যতার ফেরিওয়ালা’ কিংবা ‘মানবাধিকারের প্রবক্তা’ শব্দবন্ধ দুটি আজ চরম উপহাসে পরিণত হয়েছে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ঔপনিবেশিক যুগ থেকেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিজেদের শোষণ ও ভূখণ্ড দখলের চক্রান্তকে বৈধতা দিতে ‘সভ্য বানানোর দায়িত্ব’ (White Man's Burden) কিংবা ‘সিভিলাইজিং মিশন’-এর মিথ্যা অজুহাত ব্যবহার করে এসেছে। আজ সেই একই ঐতিহাসিক কৌশলে আধুনিক বিশ্ব মোড়ল, সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি ও তাদের পশ্চিমা মিত্ররা নিজেদের বিশ্বশান্তি ও সুশীল প্রগতির একমাত্র কাণ্ডারি হিসেবে দাবি করে। কিন্তু তাদের এই চকচকে মোড়কের পেছনে লুকিয়ে আছে সমগ্র বিশ্বকে অস্থিতিশীল করার সুগভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চক্রান্ত। আমেরিকা, যায়নবাদী ইসরায়েল এবং তাদের অনুগত শক্তিগুলো নিজেদের সভ্যতার ধ্বজাধারী বলে প্রচার করলেও বিশ্বজুড়ে বিস্তার করে চলেছে চরম বৈষম্য ও সামরিক বর্বরতা। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতাকে তারা নিজেদের স্বার্থে জিম্মি করে রেখেছে। প্রগতির বুলি আওড়ে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায্য সামরিক আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক অবরোধ আজ কোনো নীতিগত অবস্থান নয়, বরং আধুনিক আধিপত্য বিস্তারের এক কুৎসিত প্রথায় পরিণত হয়েছে।

​যে পশ্চিমা বিশ্ব আজ গণতন্ত্র ও মানবিকতার ধাবক, তাদের ইতিহাসের পরতে পরতে লেপ্টে আছে অগণিত নিরপরাধ মানুষের রক্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষলগ্নে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার তাণ্ডব চালিয়ে মুহূর্তের মধ্যে লক্ষাধিক বেসামরিক প্রাণকে ভস্মীভূত করার মধ্য দিয়ে যে কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা তারা করেছিল, আধুনিক যুগেও তার কোনো বিরাম নেই। ২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্রের সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও বানোয়াট অজুহাত দাঁড় করিয়ে আমেরিকা ও ব্রিটেন প্রাচীন ও সমৃদ্ধশালী দেশ ইরাকে যে তাণ্ডব চালাল, তা বিশ্ববিবেকের মুখে এক চরম চপেটাঘাত। পরবর্তীতে কোনো বিধ্বংসী অস্ত্রের অস্তিত্ব না মিললেও সাম্রাজ্যবাদী বাসনায় ধ্বংস করে দেওয়া হলো একটি আস্ত রাষ্ট্র; প্রহসনের বিচারে ফাঁসি দেওয়া হলো রাষ্ট্রপ্রধানকে, আর নরককুণ্ডে নিক্ষেপ করা হলো লাখ লাখ নিষ্পাপ মানুষকে। ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে আফগানিস্তান, সিরিয়া ও লিবিয়ায় তথাকথিত ‘মুক্তির’ ফেরি করতে গিয়ে তারা নগর ও জনপদকে পরিণত করেছে শ্মশানে। অনুরূপ মিথ্যা অজুহাতে সামরিক অভিযান চালিয়ে অগণিত নিরপরাধ শিশুর রক্তে হাত রাঙাতেও তাদের বিবেক একটুও কেঁপে ওঠেনি।

​এই বৈশ্বিক মোড়লদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধনে আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে জ্বলছে অশান্তির দাবানল। দক্ষিণ এশিয়ার কাশ্মীর, মিয়ানমারের নিপীড়িত রোহিঙ্গা, চীনের উইঘুর কিংবা দক্ষিণ এশিয়ায় সংঘটিত রক্তক্ষয়ী মানবিক বিপর্যয়গুলোর নেপথ্যে তাদের কৌশলগত নীরবতা ও ক্ষমতার দাবার ঘুঁটি চালনা সুস্পষ্ট। নিজেদের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে তারা কৃত্রিম বিশ্বসংকট তৈরি করে চলেছে। বিশ্বজুড়ে কেবল সামরিক আগ্রাসনই নয়, বরং তথ্যপ্রযুক্তি, চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ (Cultural Hegemony) বিস্তার করে তারা নিজেদের জীবনযাত্রাকে ‘একমাত্র সভ্য মানদণ্ড’ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক আইনের সব নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে লাতিন আমেরিকার স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব হরণ করা কিংবা স্বাধীন রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের ওপর অন্যায় সামরিক হামলা চালানো আন্তর্জাতিক মঞ্চে চরম জঙ্গলরাজের পুনঃপ্রতিষ্ঠা নির্দেশ করে।

​আজ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ থেকে যেন ঝরে পড়ছে মানব সভ্যতার শেষ অশ্রুবিন্দু। আমেরিকা ও ইসরায়েল একদিকে ইরান, লেবানন, ইয়েমেন, ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার ভূখণ্ডজুড়ে বেপরোয়া ও নির্মম বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে, আর অন্যদিকে মার্কিন পরাশক্তি প্রকাশ্যে কোনো একটি প্রাচীন সভ্যতাকে পৃথিবীর বুক থেকে রাতারাতি মুছে দেওয়ার ঔদ্ধত্যপূর্ণ হুমকি প্রদান করছে। ইসরায়েলকে অস্ত্র, বারুদ ও মারণাস্ত্রের এক বিরাট স্তূপ ও আধুনিক গুদামে পরিণত করে তারা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিনিয়ত চোখ রাঙিয়ে চলেছে; খেয়ালখুশিমতো যেকোনো সার্বভৌম ভূখণ্ডে বোমাবর্ষণ করে রক্তের হোলিখেলায় মেতে উঠেছে। ফিলিস্তিনের নিজস্ব বাসভূমে আজ যে নির্মম জাতিগত নিধন ও বর্ণবাদের অমানবিক তাণ্ডব চলছে, তা আধুনিক মানব ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম অপরাধ। অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের মাথার ওপর বোমাবর্ষণ, গৃহহীন করা এবং একটি পুরো জাতিকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার এই মহাযজ্ঞে অর্থ, অস্ত্র ও কূটনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে এই স্বঘোষিত ‘মানবাধিকারের রক্ষকরা’। ইসরায়েলের ক্রমাগত উসকানি ও সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে একের পর এক যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে আজ পুরো অঞ্চলকে তারা এক অবধারিত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

​মূলত আমেরিকা ও ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সব আইন, জেনেভা কনভেনশন ও বৈশ্বিক মানবাধিকার সনদকে পদদলিত করে আজ পুরো মানবজাতিকে জিম্মি করে ফেলেছে। একদিকে বিশ্বে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া, আর অন্যদিকে নিজেদেরকে ‘সভ্যতার ফেরিওয়ালা’ ও ‘স্বঘোষিত ত্রাণকর্তা’ হিসেবে প্রচার করা মানবজাতির সার্বভৌম সত্তার প্রতি এক চরম অপমান। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নীতির দিকে তাকালে এই দ্বিমুখী ও ভণ্ড নীতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা চরম দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। পৃথিবীতে প্রথম পারমাণবিক বোমার বীভৎস ব্যবহারকারী এবং বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রের বিপুল স্তূপ আগলে রাখা এই শক্তিগুলো অন্য রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার মৌলিক অধিকারটুকু পর্যন্ত মেনে নিতে নারাজ। এনপিটি (NPT) বা পারমাণবিক অসম্প্রসারণ চুক্তিতে চাপ দিয়ে অন্যান্য রাষ্ট্রকে স্বাক্ষর করালেও আমেরিকা বা ইসরায়েল নিজেদের ক্ষেত্রে এর কোনো তোয়াক্কা করেনি। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থাকে (IAEA) দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর পারমাণবিক স্থাপনায় নিয়মিত নজরদারি চালানো হলেও, ইসরায়েল কিংবা আমেরিকার গোপন পারমাণবিক ও জীবাণু অস্ত্রাগার সব ধরনের আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার অধরাই রয়ে গেছে।

​বস্তুত, আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার এই ছদ্মবেশী শোষকরা কোনোকালেই সভ্যতার ফেরিওয়ালা হতে পারে না; তারা মানবজাতির অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় হুমকি। প্রগতি, মানবতা ও গণতন্ত্রের বুলি যে বস্তুত তাদের ক্ষমতার লালসা ঢাকার এক সুচতুর মুখরোচক শব্দমালা—তা আজ আর বিশ্ববাসীর কাছে অজানা নয়। প্রযুক্তির অভাবনীয় শক্তির সঙ্গে যদি আত্মিক মূল্যবোধ, বৈশ্বিক বিচারবুদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক আইনের সর্বজনীন প্রয়োগ না ঘটে, তবে মানব সভ্যতা বিলুপ্তির খাতায় নাম লেখাবে। আজকের বিশ্বকে রক্ষা করতে হলে গ্লোবাল সাউথ বা উদীয়মান বহুমুখী বিশ্বের (Multipolar World) ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গড়ে তোলা জরুরি। পরাশক্তিগুলোর এই অন্যায্য, চরম দ্বিমুখী ও আধিপত্যকামী নীতির বিরুদ্ধে বৈশ্বিক সচেতনতার মহাপ্রাচীর গড়ে তুলে সত্য ও সাম্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই এখন মানবজাতি রক্ষার একমাত্র মুক্তির পথ।


লেখক: শিক্ষক, কবি ও কলামিস্ট।



আরও সংবাদ   বিষয়:  সভ্যতার ফেরিওয়ালা  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি : ড. এম এ কাইয়ুম, সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close