বৃহস্পতিবার ● ৮ অক্টোবর ২০২৬
   
শিরোনাম:
● ডিজিটাল যোগাযোগে হারিয়ে যাচ্ছে ডাকঘরের ঐতিহ্য      ● শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের সেরা ঢাবি      ● রাওয়ায় শুরু হলো ১২তম বইমেলা      ● যে ভুলের কারণে বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছে টম ক্রুজের ‘ডিগার’      ● পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের ‘ফাঁদে’ আরও ১৬ ভারতীয় নৌসেনা      ● নানা পাটেকরের সেরা ৮ সিনেমা ও আলোচিত চরিত্র      ● ১৭ বছরের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করেছে বিএনপি সরকার      ● ওসির মৃতুতে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীর শোক      ● আইফোন ১৮ প্রো রিভিউ: নতুন ফিচার, দাম ও ভালো-মন্দ      ● আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির রেকর্ডের শেষ নেই      ● ধেয়ে আসা ধ্বংসাবশেষ থেকে যেভাবে রক্ষা পেল বাংলাদেশের স্যাটেলাইট      ● এসএ২০-তে এবারও খেলা হচ্ছে না নাহিদ রানার      
ডিজিটাল যোগাযোগে হারিয়ে যাচ্ছে ডাকঘরের ঐতিহ্য
স্বদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০৪ পিএম

নিওকলোনিয়াল ডিজিটাল বর্ডারের যুগে হাতে লেখা একটি ‘চিঠি’ কিংবা ‘ডাকঘর’ কী ধরনের ইমেজ তৈরি করে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তারের এই সময়ে হয়তো মনে করাও কঠিন—শেষ কবে হাতে চিঠি লিখে কোনো ডাকবাক্স বা ডাকঘরে গিয়ে পোস্ট করা হয়েছিল।

গলির মোড়ের লাল ডাকবাক্স কিংবা হাট-বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা ডাকঘরগুলোর আজ কী অবস্থা, তা অনেকেরই অজানা। জেন-জি প্রজন্মের সঙ্গে এই ডাকব্যবস্থার প্রায় কোনো প্রত্যক্ষ পরিচয়ই হয়নি। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বহু গ্রাফিতিতে খোলা ডাকবাক্সকে মুক্তির প্রতীক হিসেবে আঁকা হয়েছিল। অর্থাৎ চিঠি ও ডাকবাক্সের স্মৃতি এখনো আমাদের ভেতরে কোনো না কোনো অনুভূতি তৈরি করে। ডাকঘর থেকে বহু দূরে সরে গেলেও ঠিকানা প্রদানের ক্ষেত্রে এখনো ‘ডাকঘর’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।

প্রতি বছর ৯ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘বিশ্ব ডাক দিবস’। মানুষের জীবন, ব্যবসা ও সামাজিক উন্নয়নে ডাকসেবার ভূমিকা তুলে ধরা এবং ডাককর্মীদের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়াই এ দিবসের উদ্দেশ্য। ১৮৭৪ সালের এই দিনে সুইজারল্যান্ডে ‘ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন’ (ইউপিইউ) প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৯ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত ইউপিইউর কংগ্রেসে ৯ অক্টোবরকে বিশ্ব ডাক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য—‘এক ডাক নেটওয়ার্ক, অসীম সম্ভাবনা’।

বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে ইউপিইউর আন্তর্জাতিক ব্যুরো আন্তর্জাতিক চিঠি লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চিঠি-সংস্কৃতি থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার খাতায় চিঠি লেখার অনুশীলন করতে হয়। অথচ বাস্তব জীবনে সেই চিঠির ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে।

হাতে লেখা চিঠিকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে বহু কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছিন্নপত্র’, রেইনার মারিয়া রিলকের ‘লেটার্স টু অ্যা ইয়াং পোয়েট’, জওহরলাল নেহরুর ‘লেটার্স ফ্রম অ্যা ফাদার টু হিস ডটার’, ফ্রানৎস কাফকার ‘লেটার্স টু মিলেনা’ কিংবা ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের চিঠিগুলো চিঠির ভেতর লুকিয়ে থাকা অসংখ্য বলা-না-বলা গল্পের সাক্ষ্য বহন করে।

হাতে লেখা চিঠির সঙ্গে ই-মেইল বা মোবাইল বার্তার সরাসরি বিরোধ তৈরি করা উদ্দেশ্য নয়। তবে একটি ঐতিহাসিক ডাকব্যবস্থা ক্রমেই হারিয়ে যাওয়ায় মানুষের সামাজিক সম্পর্ক, যোগাযোগ ও পারস্পরিক সংযোগের ধরনও বদলে গেছে। ডাকব্যবস্থার দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তর দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ডাক বিভাগের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও প্রবেশাধিকারের ধরন পরিবর্তন করেছে।

ডাকঘর শুধু চিঠি আদান-প্রদানের জায়গা ছিল না। কলেরা বা বসন্তের মতো মহামারির সময়ও ডাকঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের ওষুধ কুইনাইনও স্থানীয় ডাকঘরগুলোতে পাওয়া যেত। ফলে একেকটি ডাকঘর স্থানীয় সমাজের সঙ্গে বৃহত্তর বিশ্বের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।

গ্রামীণ সমাজে ডাকঘর, ডাকপিয়ন, চিঠি, নথিপত্র, কাগজ-কালি, খাম ও ডাকটিকিটকে ঘিরে মানুষের একটি গভীর পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারের সঙ্গে সেই সম্পর্কগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

যোগাযোগ সভ্যতার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। আর যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটি হলো ডাক। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নানা পদ্ধতিতে ডাকব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। প্রথম সমুদ্র ডাক, প্রথম ডাক সার্ভিস, ডাকটিকিট, রেলওয়ে ডাক, মুদ্রিত খাম, পোস্টাল মানি অর্ডার ও বিমান ডাক—এসবের ধারাবাহিক বিকাশের মধ্য দিয়ে আধুনিক ডাকব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

প্রাচীনকালেও বার্তা আদান-প্রদানের নানা ব্যবস্থা ছিল। রামায়ণে হনুমানের মাধ্যমে রামচন্দ্রের সীতার কাছে বার্তা পাঠানোর উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন গ্রিসেও বিজয়ের বার্তা পৌঁছে দিতে দূরপাল্লার দৌড়ের প্রচলন ছিল। পারস্য সম্রাট সাইরাস খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ডাক আদান-প্রদানের জন্য কুরিয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। পরে মুসলিম শাসকদের সময়ও ডাকব্যবস্থা বিস্তার লাভ করে। খলিফা মুয়াবিয়ার সময় দাপ্তরিক ডাক যোগাযোগের জন্য ‘দেওয়ান-ই-বারিদ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সুলতানি আমলেও ডাক পরিচালনার জন্য বিশেষ কর্মকর্তা ও বাহক নিয়োগ করা হতো। চেঙ্গিস খান ও আলাউদ্দিন খিলজির সময়ও দ্রুত ডাক যোগাযোগের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করার পর ব্রিটিশরা এ অঞ্চলের ডাকব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেয়। লর্ড ক্লাইভের সময় জমিদারি ডাকব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তবে ব্রিটিশ শাসনামলে গ্রামীণ নিম্নবর্গের মানুষের ডাকব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত। ১৮৬৮ সালের আগে গ্রামীণ ডাকঘরও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

দেশভাগের পর ব্রিটিশ আমলে প্রণীত ‘দ্য পোস্ট অফিস অ্যাক্ট, ১৮৯৮’ অনুসরণ করেই পাকিস্তান ডাক প্রশাসনের কার্যক্রম শুরু হয়। ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫৬ সালে ডাকটিকিট ও অন্যান্য কাগজপত্র বাংলা হরফে মুদ্রিত হয়। ১৯৫৯ সালে ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামে নতুন জেনারেল পোস্ট অফিস স্থাপিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধেও ডাক বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধে ডাক বিভাগের প্রায় ২০০ জন শহীদ হন এবং প্রায় ১২০টি ডাকঘর ধ্বংস হয়। ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই বাংলাদেশ তার প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশ করে। একই সময়ে মুজিবনগর সরকার যশোরের কাশিপুর মুক্তাঞ্চলে বাংলাদেশের প্রথম ডাকঘর স্থাপন করে। ২০ ডিসেম্বর ডাক অধিদপ্তর গঠিত হয়। ১৯৭৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৮৭ সালে দেশে পোস্টকোড চালু হয়। পরে ২০১৯ সালে মোবাইল ফোনভিত্তিক ডিজিটাল আর্থিক সেবা ‘নগদ’ চালু করা হয়।

একসময় ডাকঘর ছিল চিঠি, ডাকটিকিট, আঠা, সিলগালা, মোমের আগুন, ডাকবাক্স, খাম ও ডাকহরকরার স্থান। এখন ডাকঘর শুধু চিঠি বহনকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি যোগাযোগ, পার্সেল, লজিস্টিকস, ই-কমার্স ও সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো।

ইউপিইউর ২০২৩ সালের ডাক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৯ হাজার ৯৭৪টি ডাকঘর রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত চিঠি ডাকব্যবস্থা থেকে ক্রমেই হারিয়ে গেছে। বর্তমানে সরকারি নথিপত্র, এনজিও ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র, আইনগত নোটিশ, টেলিফোন বিল, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, জমির দলিল ও বইপত্রসহ নানা ধরনের সামগ্রী বেশি পরিবহন করা হয়।

চিঠি ও ডাকঘর আমাদের সমাজ ও ইতিহাসের পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। সেই সাক্ষী যদি একদিন পুরোপুরি হারিয়ে যায়, ডিজিটাল যোগাযোগের এই যুগে আমাদের সামাজিক স্মৃতি ও সম্পর্কের কতটা অবশিষ্ট থাকবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সুত্র : আগামীর সময়






স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close