
বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর মার্কেটিং নিয়ে পড়েছেন, কিন্তু পড়াশোনা শেষে মনে হচ্ছে লেখালেখিই আপনার ভালো লাগে। কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি নেওয়ার পর কয়েক বছর চাকরি করে বুঝলেন, ব্যবসার প্রতি আপনার আগ্রহ বেশি। তখন প্রশ্ন আসতেই পারে—এত বছর যে বিষয়ে পড়াশোনা করলাম, সেটি ছেড়ে অন্য কিছু করা কি ঠিক হবে?
অনেকের মধ্যেই ধারণাটি কাজ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিষয়ে পড়েছি, ক্যারিয়ারও সেই বিষয়েই হতে হবে। তা না হলে এত বছরের পড়াশোনা যেন বৃথা গেল। বাস্তবে ডিগ্রি আর ক্যারিয়ারের পথ সব সময় এত সরল নয়। কিছু পেশায় নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ অবশ্যই প্রয়োজন। চিকিৎসক, স্থপতি বা আইনজীবী হওয়ার মতো পেশায় সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি ছাড়া কাজের সুযোগ নেই। তবে যোগাযোগ, বিপণন, গণমাধ্যম, ব্যবসা, বিক্রয়, মানবসম্পদ ও প্রযুক্তির মতো অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করা মানুষ কাজ করছেন।
ধরা যাক, কেউ ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি উপন্যাস, কবিতা ও সাহিত্যতত্ত্ব পড়েছেন। পরে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কনটেন্ট নিয়ে কাজ শুরু করলেন। প্রথম দেখায় দুটি ক্ষেত্র আলাদা মনে হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হওয়া লেখার দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও গল্প বলার অভ্যাস নতুন কাজেও কাজে লাগতে পারে। অর্থাৎ বিষয় পরিবর্তন করলেই আগের সব শেখা অকার্যকর হয়ে যায় না।
তাই শুধু ডিগ্রির নাম নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক বছরে কী কী দক্ষতা অর্জন করেছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা করা, তথ্য বিশ্লেষণ, মানুষের সামনে কথা বলা, সমস্যা সমাধান কিংবা জটিল বিষয় সহজভাবে বোঝানোর মতো দক্ষতা অনেক পেশাতেই কাজে লাগতে পারে।
চার বছর একটি বিষয়ে পড়েছেন বলে পরবর্তী ৩০ বছরও একই ক্ষেত্রে থাকতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয় বেছে নেওয়ার সময় অনেকেই নিজের আগ্রহ বা ভবিষ্যতের কাজ সম্পর্কে পুরোপুরি জানেন না। পরিবার, চাকরির সুযোগ, ফলাফল কিংবা তখনকার পছন্দের ওপর ভিত্তি করে একটি বিষয় বেছে নেওয়া হতে পারে। কয়েক বছর পর নিজের সম্পর্কে আরও জানার পর পছন্দ বদলে যেতেই পারে।
আবার কেউ হিসাববিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে দুই বছর সেই ক্ষেত্রেই চাকরি করলেন। কিন্তু প্রতিদিনের কাজ ভালো লাগছে না। অন্যদিকে ছবি তোলা ও ভিডিও তৈরির কাজ করতে গিয়ে বুঝলেন, সেখানে আগ্রহ অনেক বেশি। শুধু ‘এত বছর হিসাববিজ্ঞান পড়েছি’—এই চিন্তায় আগের পেশায় আটকে থাকার আগে ভাবা দরকার, আগামী ১০ বছরও কি এই কাজ করতে চান?
অন্য বিষয়ে ক্যারিয়ার করলে পড়াশোনার পেছনে দেওয়া সময় ও বিনিয়োগ পুরোপুরি নষ্ট হয় কি না, সেটিও ভাবার বিষয়। কেউ পদার্থবিজ্ঞান পড়ে প্রশাসন ক্যাডারে গেলেন—এ ক্ষেত্রে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় ও চাকরির ক্ষেত্র আলাদা। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানে অর্জিত বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা কিংবা তথ্য নিয়ে কাজ করার অভ্যাস তার নতুন পেশাতেও কাজে লাগতে পারে। ফলে ডিগ্রির বিষয় ও চাকরির নাম না মিললেই শিক্ষার পুরো মূল্য নষ্ট হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
তবে ক্যারিয়ার বদলানোর ক্ষেত্রে বাস্তবতাও মাথায় রাখা জরুরি। নতুন পেশায় যেতে হলে আগের পদের চেয়ে ছোট পদে কাজ করতে হতে পারে, সাময়িকভাবে আয় কমতে পারে কিংবা নতুন দক্ষতা অর্জনের জন্য সময় দিতে হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ পুরোপুরি শূন্য থেকে শুরু করা নয়। আগের কাজের অভিজ্ঞতা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, সময় ব্যবস্থাপনা, দলগতভাবে কাজ করা ও দায়িত্ব নেওয়ার মতো দক্ষতা নতুন ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।
তাই হঠাৎ করে সব ছেড়ে দেওয়াও সমাধান নয়। নতুন ক্ষেত্রে যাওয়ার আগে সেটি সম্পর্কে বাস্তব ধারণা নেওয়া ভালো। কোনো কোর্স করা, ছোট প্রকল্পে কাজ করা কিংবা ওই পেশায় কাজ করছেন এমন কারও সঙ্গে কথা বলার মাধ্যমে নতুন ক্ষেত্রটি নিজের জন্য কতটা উপযোগী, তা বোঝা যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে নতুন ডিগ্রি বা বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজনও হতে পারে।
ক্যারিয়ার পরিবর্তনের আগে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—বর্তমান কাজটি কেন ভালো লাগছে না? নতুন ক্ষেত্রটির কোন বিষয়টি আকর্ষণ করছে? কিছুদিন কম বেতন বা ছোট পদে কাজ করতে হলে প্রস্তুত কি না? আর পাঁচ বছর পর নিজেকে কোন ধরনের কাজের মধ্যে দেখতে চান?
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও সেটিই পুরো ক্যারিয়ারের সীমানা নির্ধারণ করে না। সময়ের সঙ্গে মানুষের আগ্রহ ও দক্ষতা বদলাতে পারে। তাই যে বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন, সেই বিষয়েই সারাজীবন ক্যারিয়ার করতে হবে—এমন নয়। বরং অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের জন্য উপযুক্ত পথ খুঁজে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি