
মোংলায় পশুর চ্যানেলে পানির স্রোতে কয়লাবাহী লাইটার ও কার্গো জাহাজের নিচে পড়ে নৌকা ডুবির ঘটনার দীর্ঘ ৪৮ ঘণ্টা পর নিখোঁজ জেলে মোস্তফা মাঝির (৪৭) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে কিছু দূরে পশুর নদীতে মরদেহটি ভেসে উঠলে স্থানীয় জেলেরা তা উদ্ধার করেন।
পরে মরদেহটি নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন নৌপুলিশের পুলিশ সুপার মুহাম্মাদ মঞ্জুরুল মোর্শেদ। নিহত মোস্তফা মাঝি পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলার রঘুনাথপুর শয়না গ্রামের অজেদ মাঝির ছেলে। তিনি পেশায় একজন মৎস্যজীবী ছিলেন।
স্থানীয় জেলেরা জানান, গত ১ অক্টোবর রাত দেড়টার দিকে পূর্ব সুন্দরবন চাঁদপাই রেঞ্জের চরাপুটিয়া ও ভদ্রা নদীর মধ্যবর্তী চাওলা বগীর মুখে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। পিরোজপুর জেলা থেকে আসা একদল জেলে পশুর চ্যানেলে নোঙর করা তিনটি কার্গো জাহাজের পাশে নদীতে ইলিশ মাছ শিকার করছিলেন। এ সময় নদী অত্যন্ত উত্তাল ছিল এবং পানির তীব্র স্রোতে হঠাৎ নৌকাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নোঙর করা কার্গো জাহাজের নিচে ঢুকে যায়। মুহূর্তের মধ্যে নৌকা ও মাছ ধরার জালসহ ৩ জন জেলে জাহাজের নিচে তলিয়ে যান।
নৌকাটির ভেতরে থাকা শুকুর আমিন (২২) ও সানাউল্লাহ সানি (১৯) নামের দুই জেলে তীব্র স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে অলৌকিকভাবে সাঁতরে নদীর কূলে উঠতে সক্ষম হন। শুকুর আমিন কাউখালী গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে এবং সানি একই গ্রামের আব্দুর রহিমের ছেলে। তবে ভাগ্য সহায় হয়নি মোস্তফা মাঝির। তিনি পানির স্রোতে তলিয়ে যান।
দুর্ঘটনার পরপরই কার্গো জাহাজে থাকা নাবিক, স্থানীয় জেলে এবং বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের এসিএফসহ বনকর্মীরা উদ্ধারকাজ শুরু করেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, ঘটনার পর নৌপুলিশকে জানানো হলেও তারা উদ্ধার তৎপরতায় এগিয়ে আসেনি। গত শুক্রবার সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিখোঁজ মোস্তফা মাঝির পরিবারের সদস্যরা ও স্থানীয় জেলেরা বন বিভাগের সহায়তায় পশুর চ্যানেলের বিভিন্ন পয়েন্টে উদ্ধার অভিযান চালান। কিন্তু শুক্রবার রাত পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান না মেলায় হতাশা ও কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। অবশেষে শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে পশুর চ্যানেলে লাশ ভেসে উঠলে স্থানীয় জেলেরা উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত মোস্তফা মাঝিসহ কাউখালী এলাকার বেশ কয়েকজন জেলে মোংলা পৌর শহরের ওলিউর রহমানের ছেলে সুমনের সঙ্গে চুক্তিতে পিরোজপুর থেকে মোংলায় ইলিশ মাছ ধরতে এসেছিলেন।
সুন্দরবন ও পশুর চ্যানেলে মাছ ধরার জন্য তারা সুমন নামের ওই ব্যক্তির মাধ্যমেই দাপ্তরিক বা স্থানীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন বলে জানা গেছে।
তবে জেলেদের মহাজন সুমনের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।
নদীতে এত বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটার পর এবং নিখোঁজের ৪৮ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও মোংলা নৌপুলিশের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় জেলে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার দুপুরে জেলেরা নিজেদের উদ্যোগে লাশ উদ্ধার করে নৌপুলিশের হাতে তুলে দেন। কিন্তু মোংলা নৌপুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোক্তারুজ্জামান সাংবাদিকদের সামনে কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি। এমনকি মোংলা চাঁদপাই নৌপুলিশের ওই কর্মকর্তা দুর্ঘটনার খবরটি পর্যন্ত জানতেন না বা জানার চেষ্টা করেননি, যা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এদিকে স্থানীয় নৌপুলিশের এমন রহস্যজনক নীরবতা এবং উদাসীনতার বিষয়ে খুলনা অঞ্চলের নৌপুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মুহাম্মদ মঞ্জুর মোর্শেদ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বিষয়টি দেখবেন বলে জানান। তিনি এই চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিষয়ে বলেন, ঘটনাটি ঘটেছে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। ওসি কেন জানলেন না বা লাশ উদ্ধারে ব্যবস্থা নিলেন না, এ বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া লাশ ময়নাতদন্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান তিনি।
লাশ উদ্ধারের পর বর্তমানে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দরিদ্র মৎস্যজীবী মোস্তফা মাঝির এই অকাল মৃত্যুতে তার পরিবার ও কাউখালী উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামে চলছে শোকের মাতম। স্থানীয় জেলেরা এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কার্গো ও লাইটার জাহাজের বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ