
জীবনে এমন অনেক সময় আসে, যখন একসঙ্গে একাধিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এসব সিদ্ধান্ত কখনো কর্মজীবন, কখনো ব্যক্তিগত জীবন, আবার কখনো দৈনন্দিন ছোটখাটো বিষয় নিয়ে হতে পারে। সিদ্ধান্ত নেওয়া জীবনের স্বাভাবিক অংশ হলেও একের পর এক সিদ্ধান্ত নিতে থাকলে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘ডিসিশন ফ্যাটিগ’ বা সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি।
সারাদিন ধরে নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে মনোযোগ ধরে রাখা ও স্থির থাকা কঠিন হয়ে যেতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শেষ হয়ে যাচ্ছে। বরং অতিরিক্ত সিদ্ধান্তের চাপ মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলতে পারে।
ডিসিশন ফ্যাটিগের লক্ষণ
সাধারণ সিদ্ধান্ত নিতেও হিমশিম খাওয়া, সিদ্ধান্ত নিতে অস্বাভাবিক বেশি সময় নেওয়া কিংবা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া বিরক্তি বা অধৈর্যতা, বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা, শুধু সিদ্ধান্তটি দ্রুত শেষ করার জন্য সবচেয়ে সহজ বিকল্প বেছে নেওয়া এবং একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মানসিকভাবে ক্লান্ত লাগাও এর লক্ষণ হতে পারে।
কেন হয় সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি
ব্যস্ত কর্মদিবস, অতিরিক্ত দায়িত্ব, মানসিক চাপ এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। একইভাবে অবিরাম নোটিফিকেশন ও তথ্যের প্রবাহ, অতিরিক্ত বিকল্পের মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া, বিরতি না নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিখুঁত করার চেষ্টা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
এর সঙ্গে কাজ, মেসেজ, ইমেইলসহ বিভিন্ন কাজের মধ্যে বারবার মনোযোগ পরিবর্তন করতে হলেও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে।
গবেষণায় কী বলা হয়েছে
জার্নাল অব হেলথ সাইকোলজিতে প্রকাশিত ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়, প্রতিদিন মানুষকে অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ক্রমাগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে মানসিক শক্তি ও মনোযোগের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তিতে থাকা মানুষ কখনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, আবার কখনো সিদ্ধান্ত নেওয়াই এড়িয়ে যেতে পারেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের সারাদিন রোগীদের নিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অতিরিক্ত সিদ্ধান্তের চাপ তাদের বিচার-বিবেচনায় প্রভাব ফেলতে পারে এবং অনুপযুক্ত শর্টকাট নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও নিয়মিত স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে মানসিকভাবে চাপে পড়তে পারেন। ফলে নিজের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
যেভাবে মোকাবিলা করবেন
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দিনের যে সময়টিতে নিজেকে সবচেয়ে বেশি সজাগ মনে হয়, সেই সময়টি বেছে নিতে পারেন। পোশাক বা খাবারের মতো প্রতিদিনের ছোট সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সহজ রুটিন তৈরি করলে সিদ্ধান্তের সংখ্যা কমানো সম্ভব।
এ ছাড়া প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা, অপ্রয়োজনীয় কাজ সীমিত করা এবং নিয়মিত বিরতি নেওয়া উপকারী হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং মনোযোগ দিয়ে কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ফোন দূরে রাখাও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
সব সিদ্ধান্ত নিখুঁত হতে হবে—এমন প্রত্যাশা থেকেও বেরিয়ে আসা জরুরি। কিছু ক্ষেত্রে নিখুঁত সিদ্ধান্তের বদলে ‘যথেষ্ট ভালো’ সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
তবে মানসিক ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি বা সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং তা কাজ, সম্পর্ক কিংবা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উচিত। কারণ মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, ঘুমের সমস্যা ও অন্যান্য অবস্থার কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি