
অনেকের সকাল শুরু হয় এক কাপ কফি দিয়ে। কখনো ব্যস্ততার সঙ্গী, কখনো আবার দীর্ঘ আড্ডার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এই পানীয় শুধু স্বাদ বা ক্যাফেইনের জন্যই নয়, বিভিন্ন দেশের সামাজিকতা, আতিথেয়তা ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। দেশভেদে বদলে যায় কফি তৈরির পদ্ধতি, পরিবেশনের ধরন এবং পান করার রীতি।
কফি তাই অনেক দেশের কাছে শুধু একটি পানীয় নয়। এটি মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি, কথোপকথনের সূচনা, বন্ধুত্ব গড়ে তোলা, আতিথেয়তা প্রকাশ এবং বিশেষ মুহূর্ত উদযাপনের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
ইথিওপিয়া
ইথিওপিয়াকে কফি গাছের উৎপত্তিস্থল হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। দেশটিতে কফি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বন্ধু, আত্মীয় ও পরিচিতদের আমন্ত্রণ জানিয়ে কফি উৎসব আয়োজনের প্রচলন রয়েছে।
এই আয়োজনের শুরু হয় চুলায় তাজা সবুজ কফিবীজ ভাজার মাধ্যমে। অতিথিরা প্রথমে ভাজা কফির সুবাস উপভোগ করেন। এরপর বীজ গুঁড়ো করে ‘জেবেনা’ নামের ঐতিহ্যবাহী মাটির পাত্রে জ্বাল দেওয়া হয়। ছোট কাপে কফি পরিবেশনের সঙ্গে থাকে পপকর্ন বা হালকা খাবার।
এখানেই শেষ নয়। ঐতিহ্য অনুযায়ী তিন দফায় কফি পরিবেশন করা হয়। এসব ধাপ ‘আবোল’, ‘টোনা’ ও ‘বারাকা’ নামে পরিচিত। পুরো আয়োজন কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে। এর মধ্য দিয়ে মানুষ একে অন্যের সঙ্গে সময় কাটান, কুশল বিনিময় করেন এবং নিজেদের ভাবনা ভাগ করে নেন।
ইতালি
ইতালির কফি সংস্কৃতিতে এসপ্রেসোর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। দেশটির প্রচলিত রীতিতে কফি সাধারণত সাদামাটা এবং দ্রুত পান করার বিষয়। অনেকে সামান্য চিনি বা দুধ যোগ করলেও দুধযুক্ত কফি সাধারণত সকালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
সকালে ক্যাপুচিনো বা লাতে এবং এর সঙ্গে ক্রোয়েস্যান্ট খাওয়ার চল রয়েছে। তবে দিনের পরের সময়ে ইতালীয়রা সাধারণত কফিতে দুধ যোগ করেন না।
ক্যাফেতে বসে দীর্ঘ সময় ধরে কফি পান করার চেয়ে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে দ্রুত এক কাপ এসপ্রেসো শেষ করে কাজে ফিরে যাওয়ার সংস্কৃতিই সেখানে বেশি প্রচলিত।
সুইডেন
সুইডেনের কফি সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘ফিকা’। সহজভাবে একে কফি ব্রেক বলা যায়। তবে এটি শুধু কফি পান করার বিরতি নয়। কাজ বা দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সময় বের করে বন্ধু, পরিবার কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে কফি ও হালকা খাবার খাওয়ার সামাজিক রীতিই ফিকা।
পেস্ট্রির মতো হালকা খাবারের সঙ্গে বাড়িতে কিংবা কফিশপে বসেও ফিকা উপভোগ করা যায়। ব্যস্ত জীবনের মধ্যে কাছের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং সামাজিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার একটি উপলক্ষ হিসেবে ফিকা সুইডিশ সংস্কৃতিতে পরিচিত।
তুরস্ক
তুরস্কে কফি একটি প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ। তুর্কি কফি তৈরির জন্য কফিবীজ খুব মিহি করে গুঁড়ো করা হয়। এরপর পানি ও প্রয়োজনমতো চিনি দিয়ে ‘জেজভে’ নামের ছোট পাত্রে জ্বাল দেওয়া হয়।
কফি সাধারণত ছেঁকে পরিবেশন করা হয় না। ফলে কাপের তলায় কফির গুঁড়া জমে থাকে। অনেক সময় এর সঙ্গে তুর্কি ডিলাইট পরিবেশন করা হয়।
ইতালির মতো দ্রুত কফি পান করার বদলে তুরস্কে কফি ধীরে ধীরে উপভোগ করার চল রয়েছে। পরিবার, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা বিশেষ কোনো আয়োজনেও কফি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তুরস্কের কফি সংস্কৃতির আরেকটি চমকপ্রদ দিক হলো ভাগ্য গণনা। কফি পান শেষে কাপটি উল্টে রাখা হয়। কাপের ভেতরে থাকা কফির গুঁড়া জমে যে আকৃতি তৈরি করে, সেটিকে কেন্দ্র করে ব্যক্তির ভাগ্য সম্পর্কে নানা ব্যাখ্যা দেওয়ার লোকাচার রয়েছে।
ভিয়েতনাম
ভিয়েতনামের কফি সংস্কৃতিতে রয়েছে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী স্বাদ। এর মধ্যে জনপ্রিয় ‘এগ কফি’। ডিমের কুসুম, চিনি ও কনডেন্সড মিল্ক ভালোভাবে ফেটিয়ে ক্রিমের মতো তৈরি করা হয় এবং তা কফির ওপর দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ‘ক্যাফে সুয়া দা’ ভিয়েতনামের অন্যতম জনপ্রিয় কফি। এটি মূলত কনডেন্সড মিল্কের সঙ্গে তৈরি ভিয়েতনামি আইসড কফি।
সৌদি আরব
মধ্যপ্রাচ্যে অ্যারাবিক কফি বা ‘কাহওয়া’ একটি পরিচিত ঐতিহ্যবাহী পানীয়। হালকা ভাজা কফিবীজ দিয়ে তৈরি এই কফিতে সাধারণত এলাচ দেওয়া হয়। কখনো লবঙ্গ বা জাফরানও যোগ করা হয়।
ছোট কাপে কাহওয়া পরিবেশনের সময় সঙ্গে থাকে খেজুর। সৌদি আরবে অতিথিকে কফি ও খেজুর পরিবেশন করা আতিথেয়তা এবং সম্মান প্রদর্শনের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। ফলে দেশটির সংস্কৃতিতে কফি শুধু একটি পানীয় নয়, অতিথি আপ্যায়নেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দেশভেদে কফির স্বাদ, তৈরির পদ্ধতি কিংবা পরিবেশনের ধরন যতই আলাদা হোক, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের সামাজিকতা ও সংস্কৃতির নানা গল্প। কোথাও দ্রুত এক কাপ এসপ্রেসো, কোথাও কয়েক ঘণ্টার কফি আয়োজন—একই পানীয়কে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্য।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি