
ক্রিকেট বিশ্বকাপ মানেই বড় দলগুলোর লড়াই, তারকাদের উপস্থিতি আর বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচ। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তানের মুখোমুখি হওয়া এখন বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আকর্ষণ। তবে দুই দশক আগেও বিশ্বকাপের চিত্র ছিল ভিন্ন। গ্রুপ পর্বেই বড় দলগুলোর বিদায়ের ঝুঁকি ছিল, আর সহযোগী দেশগুলোর সামনে থাকত অঘটন ঘটিয়ে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ।
২০০৭ সালের বিশ্বকাপের দুটি ম্যাচ সেই বাস্তবতাকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে। প্রথমে বাংলাদেশ হারায় ভারতকে। একই দিনে আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরে যায় পাকিস্তান। দুই এশীয় পরাশক্তির আগেভাগে বিদায় শুধু ক্রিকেটীয় আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রভাব ফেলেছিল বিশ্বকাপের দর্শক ও বাণিজ্যিক হিসাবেও।
বাংলাদেশ হারায় ভারত, আয়ারল্যান্ডের কাছে পাকিস্তান
২০০৭ বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে বাংলাদেশের সঙ্গে একই গ্রুপে ছিল ভারত। ১৭ মার্চ ত্রিনিদাদের পোর্ট অব স্পেনে ভারতকে ৫ উইকেটে হারিয়ে দেয় হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ। মাশরাফি বিন মুর্তজা, মোহাম্মদ রফিক ও আবদুর রাজ্জাকদের বোলিংয়ের সামনে ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ বড় রান করতে পারেনি।
সেদিনই জ্যামাইকার কিংস্টনে আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরে যায় পাকিস্তান। গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচে হেরে পাকিস্তানের সুপার এইটে ওঠার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়।
পাকিস্তানের বিদায়ের পরদিনই ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। ১৮ মার্চ কিংস্টনের হোটেল কক্ষে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় পাকিস্তান দলের কোচ বব উলমারকে। হাসপাতালে নেওয়ার পর ৫৮ বছর বয়সী এই কোচকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তার মৃত্যু ঘিরে নানা জল্পনা তৈরি হলেও পরবর্তী তদন্তে পুলিশ এটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে জানায়।
মাঠের অঘটনের প্রভাব পড়ে বাণিজ্যেও
ভারত ও পাকিস্তানের আগেভাগে বিদায় বিশ্বকাপের মাঠের ফলাফলের পাশাপাশি টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক বাস্তবতাকেও প্রভাবিত করে। ভারতীয় দর্শকদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় পরের পর্বের ম্যাচগুলোর টেলিভিশন দর্শকসংখ্যায়ও প্রভাব পড়ে। সমসাময়িক বিভিন্ন প্রতিবেদনে সুপার এইট পর্বের ম্যাচগুলোর গড় টেলিভিশন রেটিং ভারতের প্রথম পর্বের ম্যাচগুলোর তুলনায় কমে যাওয়ার কথা উঠে আসে।
পৃষ্ঠপোষক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আসে। ভারত ও পাকিস্তানের মতো বড় বাজারের দল দ্রুত বিদায় নেওয়ায় সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক আকর্ষণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয় আয়োজকদের।
এরপর বিশ্বকাপের কাঠামোতেও একাধিক পরিবর্তন দেখা যায়। ২০১১ ও ২০১৫ বিশ্বকাপে ১৪টি দলকে দুটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছিল। প্রতিটি গ্রুপের সাত দল নিজেদের মধ্যে খেলত এবং সেরা চার দল কোয়ার্টার ফাইনালে উঠত। এতে বড় দলগুলোর গ্রুপ পর্বে বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ তৈরি হয়। ২০১১ বিশ্বকাপে ভারত ও পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালেও মুখোমুখি হয়েছিল।
২০১৯ বিশ্বকাপে আবার কাঠামো বদলে ১০ দলকে নিয়ে পূর্ণ রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে আয়োজন করা হয়। প্রতিটি দল অন্য নয় দলের বিপক্ষে খেলে। এতে বড় দলের মধ্যে নিয়মিত ম্যাচের সুযোগ বাড়লেও মূল পর্বে সহযোগী দেশগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
২০১৯ বিশ্বকাপে কোনো সহযোগী দেশ মূল পর্বে জায়গা করতে পারেনি। ২০২৩ বিশ্বকাপেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাছাইপর্ব পেরোতে পারেনি। সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে কেবল নেদারল্যান্ডস মূল পর্বে খেলার সুযোগ পায়।
২০২৭ বিশ্বকাপেও নতুন কাঠামো
২০২৭ বিশ্বকাপে আবারও পরিবর্তন এসেছে। ১৪ দলের এই আসরে গ্রুপ পর্বের পর সুপার সেভেন পর্ব থাকবে। বাছাইপর্ব পেরিয়ে আসা দলগুলোর জন্যও মূল টুর্নামেন্টে জায়গা করে নেওয়ার পথ রাখা হয়েছে।
এবার ভারত, পাকিস্তান ও বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে একই গ্রুপে রাখা হয়েছে। ফলে গ্রুপ পর্বেই বড় দলগুলোর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ দেখা যাবে। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের কাঠামো এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যাতে বড় দলগুলোর আকর্ষণীয় ম্যাচ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্যও বজায় থাকে।
২০০৭ সালের বাংলাদেশ-ভারত ও আয়ারল্যান্ড-পাকিস্তান ম্যাচ দেখিয়েছিল, একটি অঘটন কীভাবে পুরো টুর্নামেন্টের হিসাব পাল্টে দিতে পারে। সেই অভিজ্ঞতার পর বিশ্বকাপের কাঠামোতে বারবার পরিবর্তন এসেছে। বড় দলের ম্যাচ, দর্শক-আগ্রহ, সম্প্রচারমূল্য ও সহযোগী দেশগুলোর অংশগ্রহণ—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা চলছে। তবে বিশ্বকাপের আকর্ষণের একটি বড় অংশ এখনো সেই অপ্রত্যাশিত ফলের মধ্যেই—যেখানে একটি ম্যাচই বদলে দিতে পারে পুরো টুর্নামেন্টের চিত্র।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি