
ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে ধারণক্ষমতার তিনগুণেরও বেশি বন্দি থাকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দি থাকায় আবাসন, খাবার, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ পড়ছে। এতে বন্দিদের স্বাভাবিক জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাদের স্বজনরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে ৩৮২ জন বন্দি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত সেখানে বন্দি ছিলেন ১ হাজার ২১০ জন। ফলে নির্ধারিত জায়গার তুলনায় অনেক বেশি বন্দিকে অবস্থান করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত বন্দির কারণে কারাগারের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও সেলে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। রাতে ঘুমানোর জায়গা নিয়েও অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বন্দিদের।
সম্প্রতি জেলাজুড়ে মাদকবিরোধী অভিযান এবং নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের কারণে কারাগারে বন্দির সংখ্যা বাড়ছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কারারক্ষী জানান, অতিরিক্ত বন্দির চাপ শুধু আবাসন ব্যবস্থাতেই নয়, কারাগারের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাতেও প্রভাব ফেলছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বন্দির জন্য খাবার প্রস্তুত, পানি সরবরাহ, চিকিৎসা, গোসল ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে কারাগারে চিকিৎসক না থাকায় বন্দিদের হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। কারাগারে কোনো অ্যাম্বুলেন্সও নেই বলে জানান তারা।
বন্দিদের স্বজনদের অভিযোগ, জায়গার সংকটের কারণে বন্দিদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে কারা ক্যান্টিনে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে খাবার ও পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা। তাদের দাবি, ক্যান্টিন কারা কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করলে সেখানে এ ধরনের অভিযোগ ওঠা উচিত নয়।
জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামান তুহিন বলেন, কোনো ব্যক্তি অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে দণ্ডিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিচারাধীন বন্দি। তাই বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা গেলে কারাগারে বন্দির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি জামিনযোগ্য ও ছোটখাটো মামলার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জেলা সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ড. আনোয়ারুজ্জামান আজাদ বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে বন্দিদের মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে কারাগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। নতুন ভবন নির্মাণ, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা, স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব। তার মতে, ধারণক্ষমতার তিনগুণ বন্দি থাকা শুধু অবকাঠামোগত সংকট নয়; এটি বিচারব্যবস্থা, কারা ব্যবস্থাপনা ও মানবিক বন্দি-সেবার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তবে কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, অতিরিক্ত বন্দি থাকলেও বর্তমানে কারাগারে তাদের রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে এবং এ কারণে বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে না।
ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের জেল সুপার মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘হঠাৎ করেই কিছু বন্দীর চাপ বেড়েছে। বন্দীদের অধিকাংশ মাদকবিরোধী অভিযানে আটকের সাজাপ্রাপ্ত আসামি। এখন পর্যন্ত আমাদের কারাগারে যে জায়গা রয়েছে, তাতে করে অতিরিক্ত বন্দী রাখতে সমস্যা হচ্ছে না। আগে বন্দীরা যেমন বরাদ্দ পেতো, এখনও তেমনটাই পাচ্ছে।’
ক্যান্টিনে বেশি দামে পণ্য বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কারাগারের ক্যান্টিন সরাসরি কারা কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে। প্রত্যেকটা পণ্যের দাম বাইরে দেওয়া আছে। আমরা সে অনুযায়ী দাম নিই। এখানে বেশি টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি