
ঢাকার যানজটের সঙ্গে প্রতিদিনের যাত্রীদের পরিচয় দীর্ঘদিনের। দীর্ঘ সময় এক জায়গায় আটকে থাকা যেমন বিরক্তিকর, তেমনি এই যানজটের মধ্যেই গড়ে উঠেছে এক ধরনের নিজস্ব সাংকেতিক ভাষা। বাসের হেলপার থেকে শুরু করে রিকশাচালক—দ্রুত যোগাযোগের জন্য তারা এমন কিছু সংক্ষিপ্ত শব্দ ও সংকেত ব্যবহার করেন, যার অর্থ ঢাকার নিয়মিত যাত্রীদের কাছে মোটামুটি পরিচিত।
এর মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি কথা হলো, ‘ওস্তাদ, বামে প্লাস্টিক!’ এখানে ‘প্লাস্টিক’ বলতে কোনো পরিবেশগত সমস্যা বোঝানো হয় না। বরং চকচকে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রাইভেট কারকে বোঝাতে হেলপাররা এই শব্দটি ব্যবহার করেন।
ঢাকার ব্যস্ত সড়কে গাড়িগুলোকে দ্রুত চিহ্নিত করার জন্য এ ধরনের শব্দের ব্যবহার বেশ কার্যকর। কোন গাড়ি কোথায় আছে, কোন পাশ দিয়ে এগোতে হবে কিংবা সামনে কী পরিস্থিতি—দীর্ঘ ব্যাখ্যার বদলে কয়েকটি শব্দেই তা জানিয়ে দেওয়া হয়।
আরেকটি প্রচলিত সংকেত হলো, ‘বরাবর, সামনে ক্লিয়ার!’ ‘বরাবর’ বলতে মূলত সামনে এগিয়ে যেতে থাকার নির্দেশ বোঝানো হয়। রাস্তা সরু হলেও, প্রয়োজনে কিছুটা ডানে-বামে সরে হলেও এগিয়ে যেতে হবে—এই অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
‘সামনে ক্লিয়ার’ শুনে মনে হতে পারে সামনের রাস্তা পুরোপুরি ফাঁকা। বাস্তবে সবসময় তা নয়। যানজটে আটকে থাকা গাড়ির চাকা সামান্য নড়তে শুরু করলেও হেলপাররা অনেক সময় এই সংকেত দেন। মূলত সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে—এমন একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা হিসেবেই এটি ব্যবহৃত হয়।
ঢাকার এই সাংকেতিক ভাষা হেলপাররা কোনো নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ নিয়ে শেখেন না। বরং দীর্ঘদিন যানজটের শহরে কাজ করতে করতে প্রয়োজনের তাগিদে তারা এসব শব্দ ও সংকেত আয়ত্ত করেন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল—নোয়াখালী, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহসহ নানা জায়গা থেকে মানুষ জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় এসে বাসের হেলপার হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের কথাবার্তায় নিজ নিজ এলাকার আঞ্চলিক টান থাকলেও ঢাকার রাস্তায় কাজ করতে করতে যোগাযোগের ধরন অনেকটাই বদলে যায়। এখানে সঠিক ব্যাকরণের চেয়ে দ্রুত, সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্টভাবে পরিস্থিতি বোঝানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ঢাকার যানজটে একটি গাড়ির সামান্য ফাঁকা জায়গা দখল করতে একসঙ্গে কয়েকটি গাড়ি এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ফলে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ থাকে না। শহরের কোলাহল পেরিয়ে চালকের কাছে দ্রুত নির্দেশ পৌঁছে দিতে এসব ছোট ছোট শব্দই হয়ে ওঠে কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যম।
শুধু বাসের হেলপাররাই নয়, রিকশাচালকরাও নিজেদের মতো করে বিভিন্ন সংকেত ব্যবহার করেন। হেলপারদের ভাষায় ‘টেসলা’ বলতে রিকশাকে বোঝানো হয়। রিকশার বেলও তাদের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
একবার বেল বাজানো সাধারণত রিকশার উপস্থিতি জানানোর সংকেত। দুইবার বেল বাজালে সামনে থাকা কাউকে সতর্ক করা হচ্ছে বলে বোঝানো হয়। আর টানা তিনবার বেল বাজানোর অর্থ আরও সতর্কতামূলক—সামনে থাকা ব্যক্তিকে দ্রুত সরে যেতে বলা হচ্ছে, নইলে রিকশার সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে।
ঢাকার যানজট তাই শুধু গাড়ির দীর্ঘ সারি আর অপেক্ষার গল্প নয়; এর ভেতরেই গড়ে উঠেছে নিজস্ব কিছু শব্দ, সংকেত ও যোগাযোগের রীতি। ব্যস্ত শহরের কোলাহলে দ্রুত বোঝাপড়ার প্রয়োজন থেকেই তৈরি হওয়া এসব সাংকেতিক ভাষা ঢাকার নগরজীবনের এক অনন্য অংশ হয়ে উঠেছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি