মঙ্গলবার ● ৩ নভেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
● পাবনা টিটিসিতে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ      ● ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের বার্ষিক বিজ্ঞান মেলা ‘জয় অব ইনোভেশন’ অনুষ্ঠিত: তরুণ উদ্ভাবকদের সৃজনশীলতা ও টেকসই সমাধানের উদযাপন      ● ক্লাস্টার ওয়ারহেডের ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে এলো উত্তর কোরিয়ার অস্ত্রভান্ডারে      ● আশুলিয়ায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, ছুটি ৭০ কারখানায়      ● বিশ্ববাজারে ফের ঊর্ধ্বমুখী তেলের দর      ● ১০ বছর পর জবিতে জেমস, গানে মাতালেন শিক্ষার্থীদের      ● সাইবার নিরাপত্তায় ‘শক্তিশালী সংস্থা’ গঠন করতে যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া      ● রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রী      ● রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      ● ওমান উপকূলে কার্গো জাহাজে হামলা, ভারতীয় নাবিক নিহত      ● ‘নাশকতার চেষ্টা প্রতিহত করবে সরকার’      ● মাধবপুরে সোনাই নদীতে ডুবে শিশুর মৃত্যু      
পাবনা টিটিসিতে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
শিশির ইসলাম, পাবনা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১:৪৯ পিএম

অভিযোগের তীর সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, পাবনার অধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুল বারী মির্জা, কোর্স ডিরেক্টর (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুল আলীম এবং কো-অর্ডিনেটর সহযোগী অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে 

 শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পেই উঠেছে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন। পাবনা সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন (LAISE) প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত বেসিক ও প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং (PDT) কার্যক্রমে কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবে সেবা ও সুবিধা না দিয়েই তৈরি করা হচ্ছে বিল-ভাউচার। এমনকি অতিথি আপ্যায়ন, খাবার, শিক্ষা সফর, আবাসন ও প্রশিক্ষণ উপকরণসহ বিভিন্ন খাতে ভুয়া নাম ব্যবহার করে অর্থ ব্যয়ের হিসাব দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।


প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, সরকারি বাজেটে ২০ জন অতিথির আপ্যায়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে কোনো কোনো অনুষ্ঠানে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে মাত্র দুই থেকে তিনজনকে। অথচ কাগজে-কলমে দেখানো হচ্ছে পূর্ণসংখ্যক অতিথির আপ্যায়ন। বাকি অতিথিদের নাম ব্যবহার করে বিল-ভাউচার তৈরির অভিযোগও রয়েছে।

অর্থ বিভাগের ১৭ এপ্রিল ২০২৫ তারিখের সরকারি পত্র ও সংযুক্ত বাজেট শিটে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ, লোকসংখ্যা, কর্মদিবস, ইউনিট রেট ও মোট ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান, অতিথি আপ্যায়ন, প্রশিক্ষণার্থী ভাতা, খাবার, আবাসন, হ্যান্ডআউট, শিক্ষা সফর, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রশিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সম্মানীসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দুটি ব্যাচে মোট ৮০ জন প্রশিক্ষণার্থী এবং ১২ জন শিক্ষক-প্রশিক্ষক রয়েছে। বেসিক ট্রেনিংয়ের মেয়াদ ৫৬ দিন, এর মধ্যে কর্মদিবস ৪০ দিন। অন্যদিকে PDT কোর্সের মেয়াদ ৪২ দিন, যার মধ্যে কর্মদিবস ৩০ দিন। 

জনপ্রতি দৈনিক খাবারের জন্য বরাদ্দ ৬০০ টাকা। ১০ শতাংশ ভ্যাট বাদ দিলে কার্যকর বরাদ্দ দাঁড়ায় ৫৪০ টাকা। এই হিসাবে ৮১ জনের জন্য বেসিক ট্রেনিংয়ের ৫৬ কর্মদিবসে খাবার খাতে বরাদ্দ ২৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। PDT কোর্সের ৪২ কর্মদিবসে বরাদ্দ ৯ লাখ ২৯ হাজার ৮৮০ টাকা। অর্থাৎ নিয়মিত খাবার খাতেই দুটি কোর্সে মোট বরাদ্দ ৩৩লাখ ৮০ হাজার টাকা।

এর বাইরে উদ্বোধনী ডিনার, মেস নাইট, গেস্ট নাইট ও সমাপনী ডিনারের জন্য রয়েছে পৃথক বরাদ্দ। এসব আয়োজনে ১২০ জনের হিসাব ধরে জনপ্রতি ৫৪০ টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা বরাদ্দ থাকার কথা বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কিন্তু প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, প্রশিক্ষণ চলাকালে নিয়মিত ভাউচার সংরক্ষণ না করে কোর্স শেষে হিসাব সমন্বয়ের জন্য ভাউচার তৈরির ঘটনা ঘটছে। দুটি গ্রুপের খাবার খাতে প্রায় ১২ লাখ টাকা অব্যয়িত থাকার সম্ভাবনা থাকলেও ওই অর্থের প্রকৃত হিসাব প্রশিক্ষণার্থীদের জানানো হয়নি।

শিক্ষা সফরের জন্য প্রশিক্ষণার্থী ও অতিথিসহ রাজশাহীতে এক দিনের শিক্ষা সফরের জন্য শুধু গাড়িভাড়া বাবদ ২০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হলেও প্রকৃত ব্যয়, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এবং অব্যয়িত অর্থের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।

প্রতি ব্যাচে হ্যান্ডআউট সরবরাহের জন্য ৫৬ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় উপকরণ যথাযথভাবে সরবরাহ না করেই বিল-ভাউচার তৈরির অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে প্রশিক্ষণ কিট, প্রশিক্ষণ উপকরণ, সার্টিফিকেট, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, পুরস্কার, ফটোগ্রাফি, চিকিৎসা, পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য খাতে বরাদ্দের বিপরীতে প্রকৃত ব্যয় কত হয়েছে, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন প্রশিক্ষণার্থীরা।

আবাসিক সুবিধার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা অসন্তোষ। প্রশিক্ষণার্থীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, জনপ্রতি প্রতিদিন ৩০০ টাকা হিসাবে বেসিক ট্রেনিংয়ের ৫৬ দিনে ১৬ হাজার ৮০০ টাকা এবং PDT কোর্সের ৪২ দিনে ১২ হাজার ৬০০ টাকা আবাসন খাতে বরাদ্দ থাকার কথা।

কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন, হোস্টেলে টানা ১৫ দিনেও বিছানার চাদর পরিবর্তন করা হয় না। অধিকাংশ কক্ষের মশারি ছেঁড়া, পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই।

অভিযোগে আরও জানা যায়, পিটি প্রশিক্ষণের জন্য প্রতি ব্যাচে দুজন করে মোট আটজন প্রশিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে রয়েছেন মাত্র দুজন। তরিকুল ইসলাম নামে একজন ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টকে পিটি প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ তাঁর বিপিএড ডিগ্রি নেই বলে দাবি করেছেন প্রশিক্ষণার্থীরা।

ক্লাস বণ্টন নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ। তাঁদের অভিযোগ, কোর্স পরিচালক নিজে ৫০ থেকে ৭০টি ক্লাস নিলেও অন্য কয়েকজন শিক্ষককে মাত্র ১২ থেকে ১৫টি ক্লাস দেওয়া হয়েছে।

প্রশিক্ষণার্থীদের দাবি, খাবার, অতিথি আপ্যায়ন, শিক্ষা সফর, হ্যান্ডআউট, আবাসন ও অন্যান্য খাতে প্রতি সেশনে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অনিয়মের আশঙ্কা রয়েছে। একাধিক সেশনের প্রকৃত ব্যয়, বিল-ভাউচার, উপস্থিতির তালিকা এবং ব্যাংক লেনদেনের হিসাব নিরীক্ষা করা হলে কোটি টাকার আর্থিক অসংগতির চিত্র বেরিয়ে আসবে।

এ ঘটনায় সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, পাবনার অধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুল বারী মির্জা, কোর্স ডিরেক্টর (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুল আলীম এবং কো-অর্ডিনেটর সহযোগী অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে কোর্স ডিরেক্টর (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুল আলীম স্বদেশ প্রতিদিন কে বলেন, “প্রতি সেশনে কলেজের একজন শিক্ষক ও দুজন প্রশিক্ষণার্থীকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। তাঁদের সমন্বয়েই খাবার, বাজার, হ্যান্ডআউট, ট্যুর, ক্রীড়াসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং অর্থ ব্যয় করা হয়।” তিনিও অনিয়মের বিষয়টিকে এড়িয়ে যান।

অন্যদিকে কো-অর্ডিনেটর সহযোগী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম স্বদেশ প্রতিদিন কে বলেন, “২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা নয়, বরং অনেক হিডেন খরচ থাকে, যেগুলো আসলে চোখে দেখা যায় না। সবাইকে বোঝানো সম্ভব নয়। তবে একটি সেশনে মোটামুটি ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আমাদের থাকে।”

অভিযোগের বিষয়ে কোর্স পরিচালনার অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুল বারী মির্জা সাথে মুঠোফোনে একাধিক বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

অভিযোগের বিষয়ে LAISE প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান মুঠোফোনে স্বদেশ প্রতিদিন কে বলেন, “প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে এমন অভিযোগ এর আগেও পেয়েছি। আমরা অনিয়মের বিষয়ে ইন্টারনাল মনিটরিং করেছি। কিছু অনিয়মের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংশোধনের জন্য প্রকল্প থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো এবং মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের উদ্দেশ্যে নেওয়া LAISE প্রকল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার হিসাব নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।







স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি


আরও সংবাদ   বিষয়:  পাবনা   টিচার্স ট্রেনিং কলেজ   LAISE প্রকল্প   আর্থিক অনিয়ম   প্রশিক্ষণ কার্যক্রম   সরকারি অর্থ   শিক্ষা মন্ত্রণালয়   তদন্তের দাবি  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি : ড. এম এ কাইয়ুম, সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close