শনিবার ● ৩ অক্টোবর ২০২৬
   
শিরোনাম:
ঢাকার মাদক বাণিজ্যে শিশুদের ব্যবহার করছে চক্রগুলো
স্বদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৫০ পিএম

রাজধানী ঢাকার মাদক ব্যবসায় যুক্ত ব্যক্তিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিশু। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশের বয়স ১৫ বছর বা তার কম। কর্মসংস্থানের অভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং জবরদস্তির মতো বিষয় শিশুদের মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
সম্প্রতি রাজধানীর কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে অটোরিকশায় মোহাম্মদপুরের দিকে যাওয়ার সময় এক কিশোরের ব্যাগ থেকে ছয় কেজি গাঁজা উদ্ধার করে পুলিশ। গত ১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বছিলা চেকপোস্টে অটোরিকশাটি থামিয়ে তল্লাশি চালানোর পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুধু এই কিশোর নয়, বিভিন্ন সময় মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরও অনেক কিশোরকে গ্রেপ্তার করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ঢাকার মাদক ব্যবসার ধরন ও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘আনভেইলিং প্যাটার্নস অ্যান্ড সোশিওডেমোগ্রাফিক ক্যারেক্টারিস্টিকস অব ড্রাগ ট্রাফিকিং ইন ঢাকা সিটি, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি গত ১০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী পিএলওএস ওয়ানে প্রকাশিত হয়। ঢাকায় মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ১ হাজার ১৬ জনের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

আর্থসামাজিক ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা

গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ আর্থসামাজিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিলেন। তাঁদের গড় বয়স ছিল ২৬ দশমিক ৭ বছর। অংশগ্রহণকারীদের ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত বা এর নিচে।

গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ২৯ শতাংশ ফুটপাতে বসবাস করতেন। আরও প্রায় ১০ শতাংশ নিজেদের গৃহহীন বা ভাসমান হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। নারী অংশগ্রহণকারীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পেশাদার যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করার কথা জানিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক বিক্রিতে যুক্ত শিশুদের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। নারী অংশগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থানের অভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে। পাশাপাশি শিশু ও নারীদের ক্ষেত্রে জবরদস্তির মাধ্যমে মাদক ব্যবসায় যুক্ত করার তথ্য পাওয়া গেছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সুযোগের অভাবকে বেশি উল্লেখ করা হয়েছে।

শিশুদের মধ্যে ইয়াবা বিক্রির প্রবণতা বেশি

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর বা তার কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। হেরোইন বিক্রির ক্ষেত্রেও এই বয়সী শিশুদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রির প্রবণতা বেশি। যৌন পেশায় যুক্ত নারীদের মধ্যে ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ততা তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। অন্যান্য নারী অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে হেরোইন ও গাঁজা বিক্রির হার বেশি ছিল।

গবেষণার প্রধান গবেষক ড. শাফায়াত হোসেন সমকালকে বলেন, গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ২৮ শতাংশের বয়স ১৫ বছর বা তার কম। এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, ঢাকার মাদক বাণিজ্যে শিশুদের ব্যবহার করা তাদের শোষণের একটি চিত্র তুলে ধরে।

তিনি বলেন, ১৫ বছর বা তার কম বয়সী শিশুরা সাধারণত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহের বাইরে থাকতে পারে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে মাদক সিন্ডিকেটগুলো শিশুদের জোর করে বা কৌশলে ব্যবহার করছে। বিষয়টি শিশু সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এলাকাভেদে মাদক বিক্রির ধরনে পার্থক্য

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রির ধরনেও পার্থক্য পেয়েছেন গবেষকেরা। গবেষণায় অংশ নেওয়া ১ হাজার ১৬ জনের মধ্যে ২৫৩ জন শুধু গাঁজা বিক্রির কথা জানিয়েছেন। তাঁদের বেশি উপস্থিতি পাওয়া গেছে পল্টন ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়।

শুধু ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ২৮৫ জন। তাঁদের বেশি উপস্থিতি ছিল কমলাপুর রেলস্টেশন ও বাড্ডা এলাকায়।
এ ছাড়া ২২৮ জন গাঁজা ও ইয়াবা—দুই ধরনের মাদক বিক্রির কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মূলত ফার্মগেট ও তেজগাঁও এলাকায় বেশি সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, ২৫০ জন গাঁজা ও হেরোইন—দুই ধরনের মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের বেশি উপস্থিতি দেখা গেছে সাভার ও পল্টনে।

মাদক পাচারের একাধিক রুট চিহ্নিত

গবেষণায় হেরোইন, গাঁজা ও ইয়াবা ঢাকায় প্রবেশের কয়েকটি আন্তঃসীমান্ত রুটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হেরোইন পাকিস্তানের লাহোর থেকে ওয়াঘা সীমান্ত হয়ে ভারতের পাটনা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। পরে সাভার, মিরপুর, মহাখালী ও মতিঝিলসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়ে। গাঁজা প্রবেশের দুটি প্রধান রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর একটি ভারত থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে এবং অন্যটি কুমিল্লা হয়ে ঢাকায় এসেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ইয়াবার উৎস হিসেবে মিয়ানমারের কথা বলা হয়েছে। টেকনাফ সীমান্তের পাশাপাশি ভারতের মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে ইয়াবা প্রবেশের রুটের কথাও উঠে এসেছে। এসব পথে সিলেট ও সুনামগঞ্জ হয়ে ঢাকায় মাদক পৌঁছানোর তথ্য দেওয়া হয়েছে। গবেষকেরা মিয়ানমার, মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে আসা ইয়াবার রুটকে বৃহত্তর ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ মাদক পাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া ভারত থেকে জামালপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ হয়ে বাংলাদেশে মাদক প্রবেশের আরও কয়েকটি রুটের কথা বলা হয়েছে।

গবেষণার মানচিত্রে তিনটি প্রধান আন্তঃসীমান্ত রুট আলাদাভাবে দেখানো হয়েছে। এগুলো হলো পাকিস্তানের লাহোর থেকে ওয়াঘা ও পাটনা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের রুট, ভারত থেকে মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের রুট এবং মিয়ানমারের টেকনাফ হয়ে ঢাকায় আসার রুট।


নমুনা নির্বাচনের সীমাবদ্ধতা

গবেষকেরা জানিয়েছেন, অংশগ্রহণকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ‘পারপাসিভ’ ও ‘স্নোবল স্যাম্পলিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, অংশগ্রহণকারীদের এলোমেলোভাবে নির্বাচন করা হয়নি। বরং অবৈধ ও গোপন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছাতে পরিচিত ব্যক্তি ও বিভিন্ন নেটওয়ার্কের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
এ কারণে গবেষণার ফলাফলকে পুরো ঢাকা শহরের মাদক বিক্রেতাদের প্রতিনিধিত্বকারী পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

গবেষণাটিতে নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম ও ঢাকার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শাফায়াত হোসেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষণা কেন্দ্র এভিডেন্স ফর পলিসি অ্যান্ড প্র্যাকটিস ইনফরমেশন সেন্টারের গবেষক গ্যারেথ জে হল্যান্ডস, সৌদি আরবের ইমাম মোহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটির বৈজ্ঞানিক গবেষণা-সংক্রান্ত বিভাগের ডিন মো. আলামিন, চীনের চাংঝু ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. রোকনুজ্জামান, ঢাকার মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মাহদী হাসান এবং সিরাজগঞ্জের মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (ম্যাটস) শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার।



স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close