| শিরোনাম: |

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সাবেক ছাত্রী মমতাজ আরা বর্ষাকে আটকের চেষ্টা ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। গত ৬ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার কলতাবাজারের একটি মেসে র্যাবের সদস্যরা তাঁকে আটক করতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে জানা যায়, রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের হওয়া একটি চুরির মামলায় বর্ষা এজাহারভুক্ত আসামি।
ঘটনার পর থেকে বর্ষা মেসে নেই। তাঁর মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ নেই বলে জানিয়েছেন তাঁর বোন। ফলে বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বর্ষা জবির নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর দুই সহপাঠীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে তিনি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
সাদাপোশাকে মেসে র্যাব
পুরান ঢাকার কলতাবাজারের একটি সাততলা ভবনের সপ্তম তলায় মেসে থাকতেন বর্ষা। গত ৬ সেপ্টেম্বর সকাল পৌনে সাতটার দিকে একটি মাইক্রোবাসে করে তিন ব্যক্তি সেখানে যান। তাঁদের কারও পরনে র্যাবের পোশাক ছিল না।
মেসের নিরাপত্তাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে ওই ব্যক্তিরা বর্ষার কক্ষে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং দরজা খুলতে বলেন। মেসের বাসিন্দারা শুরুতে দরজা খুলতে রাজি হননি। পরে গালাগাল ও ধাক্কাধাক্কির অভিযোগের মধ্যে তাঁরা দরজা খুলতে বাধ্য হন বলে জানিয়েছেন কয়েকজন রুমমেট।
এরপর ওই ব্যক্তিরা মেসে তল্লাশি চালান এবং বর্ষাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বিষয়টি জানতে পেরে মেসের বাসিন্দারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জকসু) নেতাদের জানান।
খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। পরে সেখানে র্যাবের আরেকটি গাড়ি ও স্থানীয় থানার পুলিশও উপস্থিত হয়। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বাধায় বর্ষাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
জবির পরিবহন প্রশাসক তারেক বিন আতিক জানান, প্রথমে ওই ব্যক্তিরা ভুল করে সেখানে এসেছেন বলে দাবি করেন। পরে তাঁরা চুরির মামলার আসামিকে ধরতে এসেছেন বলে জানান। এর মধ্যেই বর্ষাকে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়।
ঘটনার দিন জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত বর্ষাকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
বর্ষার অভিযোগ
ঘটনার পর ওই দিন বিকেলে জবির ভাষাশহীদ রফিক ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন বর্ষা। সেখানে তিনি দাবি করেন, তাঁর বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়া র্যাবের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে কাজ করেন। প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর মাধ্যমে র্যাবকে ব্যবহার করে তাঁকে আটক করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বর্ষা।
তবে র্যাব জানিয়েছে, র্যাব-২-এ সুমন নামে কেউ কাজ করেন না। বাহিনীটির ১৫টি ব্যাটালিয়ন রয়েছে। পুরো নাম ও পদবি ছাড়া কোনো ব্যক্তির বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া কঠিন বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

এখন মেসেও নেই বর্ষা
ঘটনার পর বর্ষার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। ৭ ও ৮ সেপ্টেম্বর কলতাবাজারের মেসে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
মেসের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বর্ষা দুটি টিউশনি করতেন এবং সেখান থেকে মাসে প্রায় সাড়ে সাত হাজার টাকা আয় করতেন। মেসে দুটি আসনের ভাড়া বাবদ তাঁর প্রায় ছয় হাজার টাকা খরচ হতো। তবে প্রায় তিন মাস আগে তিনি টিউশনি ছেড়ে দেন।
ভবনের এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, বর্ষা তাঁকে বলেছিলেন, কেউ তাঁকে খুঁজতে এলে যেন বলা হয় তিনি সেখানে থাকেন না।
বর্ষার বোন বৃষ্টি দিনাজপুরে থাকেন। মঙ্গলবার রাতে তিনি জানান, দুই দিন ধরে পরিবারের কেউ বর্ষার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
বৃষ্টি বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে বর্ষাকে টাকা পাঠানো হতো। পাশাপাশি তিনি টিউশনি করতেন। অনলাইনে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার পাশাপাশি একসময় নিজের একটি প্রতিষ্ঠানও পরিচালনা করেছেন বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, ওই সময় বর্ষা হ্যাকিং সম্পর্কেও দক্ষতা অর্জন করেন।
‘জিনের ভর’ থেকে চুরির মামলা
বর্ষাকে আটকের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের করা একটি চুরির মামলার তথ্য পাওয়া যায়। গত ১২ আগস্ট মামলাটি করেন র্যাব-২-এ কর্মরত একজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার।
মামলায় ওই কর্মকর্তার গাড়িচালক মো. রাসেল ও তাঁর স্ত্রী মাছুরা বেগমকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, রাসেল ওই পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীকে বলেন, তাঁর স্ত্রী মাছুরার ওপর ‘জিন ভর করেছে’। সেই জিন পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের বিভিন্ন তথ্য জানে এবং তার কথামতো চললে পেশাগত উন্নতি ও পারিবারিক বিপদ দূর হবে—এমন কথা বলা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই কৌশলে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীর কাছ থেকে টাকা ও সোনার গয়না নেওয়া হয়। পরে চেতনানাশক খাইয়ে অর্থ ও স্বর্ণালংকার চুরির অভিযোগও করা হয়েছে। এজাহারে খোয়া যাওয়া নগদ অর্থের পরিমাণ ১৪ লাখ টাকা এবং সোনার পরিমাণ ১০ ভরি উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে আরও বলা হয়েছে, রাসেল ও তাঁর স্ত্রী মাছুরা চুরি করা সোনা বর্ষার কাছে বিক্রি করেন। এ ঘটনায় বর্ষার নাম সন্দেহভাজন হিসেবে তদন্তে আসে।
ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসান জানান, মামলার দুই আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বর্ষাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন হওয়ায় তাঁকে আটক করতে র্যাবের সহযোগিতা চেয়ে থানার পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছিল।
র্যাবের বক্তব্য
র্যাব-২-এর পরিচালক ও পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নয়মুল হাসান বলেন, র্যাবের অভিযানে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি। এজাহারভুক্ত আসামিকে ধরতেই র্যাবের সদস্যরা সেখানে গিয়েছিলেন। তবে সেখানে আসামিকে আটক না করতে র্যাবের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে জবির সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির বলেন, বর্ষাকে আটক করতে প্রথমে যাঁরা মেসে গিয়েছিলেন, তাঁরা নিজেদের পরিচয় স্পষ্ট করতে পারেননি। তাঁদের কাছে কোনো নথি বা মামলার এজাহারও ছিল না। এ কারণেই ঘটনাটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, ৬ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বর্ষা কিংবা তাঁর পরিবারের কারও সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যোগাযোগ হয়নি।
তাঁর ভাষ্য, বর্ষা যদি কোনো অপরাধে জড়িত থাকেন, তাহলে প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী তাঁর বিচার হবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ