
বেপরোয়া বাইকার ও কার রেসিংয়ের দখলে দিনদিন ঝুঁকিপূর্ণ আর ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে বহুল পরিচিত ৩০০ ফিট সড়ক তথা পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে। রাত নামলেই দৃষ্টিনন্দন আর কোলাহলহীন সড়কটি হয়ে ওঠে মৃত্যুপুরীতে। কার রেসার আর বাইকারদের উশৃঙ্খল আচরণে দিন দিন দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে পড়ছে পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়ক। বেপরোয়া গতিতে বাইক চলাচলের কারণে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা আর প্রাণহানি ঘটছে। এ সড়কে দুর্ঘটনা রোধে তাই এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবহারকারীরা। রাতে নগরীর রাস্তাঘাট অনেকটা নীরব ও ফাঁকা থাকার সুযোগে তুমুল বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বাইকাররা। এ সময় পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কে একদিকে চলে বাইকারদের বেপোরোয়া গতির প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে টিকটক ভিডিও ধারণসহ চলে যুবক-যুবতীদের নানান স্ট্যান্ডবাজি। রাত ২-৩টা পর্যন্তও এমন দৃশ্য দেখা যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শব্দ দূষণের মতো বিড়ম্বনাও। পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কজুড়ে পুলিশের বেশ কয়েকটি চেকপোস্ট থাকলেও কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বেপরোয়া বাইক চলাচল।
দৃষ্টিনন্দন প্রশস্ত রাস্তা, দুপাশে সুবিন্যস্ত সারিবদ্ধ গাছ আর চারপাশের খোলামেলা মনোরম পরিবেশ— সব মিলিয়ে রাজধানী ঢাকার অন্যতম সুন্দর ও বৃহত্তম সড়ক হিসেবে পরিচিত পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে বা লোকমুখের ‘৩০০ ফিট’ সড়ক। দিনের বেলা এই সড়কে সাধারণত কোনো যানজট বা কোলাহল থাকে না, যা নগরবাসীকে এক অদ্ভুত স্বস্তি দেয়। কিন্তু রাতের অন্ধকার নামতেই সম্পূর্ণ বদলে যায় এই রূপালী সড়কের চিরচেনা দৃশ্যপট। দিনের শান্ত পরিবেশ রূপ নেয় এক ভয়ঙ্কর আতঙ্ক ও মৃত্যুর উপত্যকায়। স্থানীয় বাসিন্দা এবং নিয়মিত যাতায়াতকারীদের কাছে এটি এখন পরিচিত এক ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে। বর্তমানে রাজধানীর সড়কগুলোর মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকির শীর্ষ তালিকায় রয়েছে দৃষ্টিনন্দন এই এক্সপ্রেসওয়েটি। ঠিক কী কারণে রাতে এত বিপজ্জনক হয়ে উঠছে এই আধুনিক পথ, তা জানতেই রাতের অন্ধকারে ৩০০ ফিট সড়কে চালানো বিশেষ সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কিছু রোমহর্ষক ও উদ্বেগজনক চিত্র।
বিশেষজ্ঞের এই আশঙ্কা আর রাজপথের নির্মম বাস্তবতা হাজারো প্রশ্নের জন্ম দেয়। যদিও সড়কের বিভিন্ন অংশে গতিসীমা নির্দেশক সাইনবোর্ড রয়েছে, তবে সেই নির্দেশনা মানার প্রবণতা চালকদের মধ্যে একদমই নেই। সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা জানান, অতিরিক্ত বেপরোয়া গতির কারণে এই সড়কে প্রায়ই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত নয় মাসে এমন ৩২টি পৃথক সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনায় ৩২ জন তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, যা ৩০০ ফিট সড়ককে মধ্যরাতের একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত করেছে।
অনুসন্ধানের শুরুতে আপাতদৃষ্টিতে এক্সপ্রেসওয়েটিতে অস্বাভাবিক কিছু চোখে না পড়লেও, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই উন্মোচিত হতে থাকে এর ভিন্ন এবং বিপজ্জনক রূপ। স্থানীয়দের মতে, রাত যত গভীর হয় এই সড়কে দুরন্ত গতির বিলাসবহুল যানবাহন ও ভারী মোটরসাইকেলের আনাগোনা ততই বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে পুরো সড়কটি যেন বেপরোয়া গতির বাইকারদের দখলে চলে যায়। মাঝরাতে এখানে শুধু যে সাধারণ গতিসীমা লঙ্ঘন করা হয় তা নয়, বরং সব ধরনের ট্র্যাফিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলে গতির মরণখেলা, যা এই রাস্তার রাতের নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি সন্ধ্যা হলেই একদল যুবক-যুবতী মেতে ওঠে টিকটক ভিডিও ধারণসহ নানা ধরনের স্ট্যান্ডবাজিতে। সেই সাথে এলাকার কিশোর ও তরুণদের বাজে আচরণ তো রয়েছেই।

এই ভয়ঙ্কর স্পিডিং বা রেসিংয়ে কোন ধরনের যানবাহন বেশি অংশ নেয়— জানতে চাইলে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, স্পোর্টস মোটরসাইকেল এবং দ্রুতগতির প্রাইভেট কার উভয়ই এই মরণ খেলায় লিপ্ত হয়। এর মধ্যে বেশ কিছু বিশেষভাবে মডিফাইড করা প্রাইভেট কারও রয়েছে। এদের গতি এতটাই অনিয়ন্ত্রিত ও উচ্চমাত্রার থাকে যে, অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িগুলো ডিভাইডারের ওপর দিয়ে ডিগবাজি খেয়ে এক লেন থেকে অন্য লেনে ছিটকে পড়ে। পুরো শহর যখন গভীর ঘুমে মগ্ন, তখনও কৃত্রিম আলোয় জেগে থাকে ৩০০ ফিটের এই ঝলমলে সড়ক। মোটরসাইকেল চালক ও উৎসুক তরুণদের ভিড়ে চারদিকে এক উগ্র উত্তেজনার স্পন্দন দেখা যায়। কোথাও চলে গভীর রাতের আড্ডা, আবার কোথাও চলে রেসিংয়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি। স্থানীয়রা আরও জানান, মধ্যরাত থেকে ভোর প্রায় ছয়টা পর্যন্ত রাস্তা পুরোপুরি ফাঁকা থাকে, আর এই সুযোগটিকেই কাজে লাগায় রেসাররা। রাত ২টার দিকেও দেখা যায়, একদল তরুণ মোটরসাইকেল রেসিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এর কিছুক্ষণ পরই বিকট শব্দে শুরু হয় তীব্র গতির প্রতিযোগিতা।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, এ সড়কে রাতের মায়াবী দৃশ্য বিমোহিত করে নগরবাসীকে। তাই তো পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কের সৌন্দর্য দেখতে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে ছুটে আসেন অনেকে। তবে প্রতিনিয়ত বাইকারদের এমন উশৃঙ্খল আচরণে আবেদন হারাচ্ছে দৃষ্টিনন্দন এই সড়ক। তরুণ বাইকাররা কোনো নির্দেশনা মানতে চায় না বলেও অভিযোগ সাধারণ মানুষের। এই দুর্ঘটনা রোধ করতে না পারলে ম্লাণ হয়ে যাবে এ সড়কের নির্মাণের উদ্দেশ্য। খিলক্ষেত থানার এসআই শাহীনুর আলম বলেন, চেকপোস্টের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী যথেষ্ট পরিমাণে নেই। ফলে এক সঙ্গে ১৫-২০ জন বাইকার আসছে, তাদের থামানোও সম্ভব হচ্ছে না। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা যানবাহনের চাপ কমে যাওয়ায় উচ্চ গতি ও স্যান্ডবাজিতে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা ঘটছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজউক পূর্বাচল প্রকল্পের একজন সহকারী প্রকল্প পরিচালক বলেন, পূর্বাচল প্রকল্পে কেন এতো দুর্ঘটনা ঘটছে এটা নিরীক্ষণের জন্য আমরা বুয়েটকে দায়িত্ব দিয়েছি। যেহেতু সড়কটি বুয়েট প্ল্যান করেছে এবং এই রাস্তাটি আধুনিকায়নে বুয়েট বিভিন্নস্থানে ইউলুপ, সংযোগ সড়ক, বিভিন্ন পরিবহন ও স্থানে যাতায়তের জন্য আলাদা সড়ক, সৌন্দর্য বর্ধনে চিন্তা ভাবনা করছে তাই তাদের সুপারিশ অনুসারেই কাজ করতে হবে। তবে জনগণের জানমালের স্বার্থে রাজউক যেকোনো সময় এস্থানটি আবারো শুদ্ধভাবে সংস্কার করে দিতে প্রস্তুত।
পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কে বেপরোয়া মোটরসাইকেল ও গাড়ি চলানোর বিষয়টি নিয়ে জটিল অবস্থার তৈরি হয়েছে। দ্রুত গতিতে মোটরসাইকেল ও গাড়ি চালানোর ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে করে মৃত্যুর পাশাপাশি অনেকেই পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন। পুলিশ বেপরোয়া বা দ্রুত গতিতে গাড়ি চালকদের বিরুদ্ধে কাজ করছে। কিন্তু এদের কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা স্পিড গানও (গতি পরিমাপক যন্ত্র) ব্যবহার করছি। সকলের সমন্বয় পদক্ষেপ ছাড়া পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়ক নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গত ২৬ জানুয়ারি পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কের খিলক্ষেত থানা এলাকায় ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে মোটরসাইকেলের দুই আরোহীর মর্মান্তি মৃত্যু হয়। এ দুর্ঘটনায় একজন আহতও হন। দুর্ঘটনাটি ঘটে খিলক্ষেতের মাস্তুল এলাকার ৩০০ ফিট সড়কে। মোটরসাইকেলটিতে চালকসহ তিনজন আরোহী ছিলেন। মোটরসাইকেলটি পূর্বাচলের দিক থেকে আসছিল। ট্রাকটি বিপরীত দিক থেকে যাচ্ছিল। ট্রাকের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। গাড়ি ও বাইকের প্রতিযোগিতা, অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। গুলশান ট্রাফিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ট্রাফিক আইন ভাঙার অভিযোগে প্রায়ই যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। পাশাপাশি রেকার দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া এবং ডাম্পিংয়ে পাঠানো হচ্ছে মোটরসাইলে ও প্রাইভেটকার। এর পরেও ৩০০ ফিট সড়কে মোটরসাইকেল চালকদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড বসিয়েও অভিযান চালানো হয় বলে ওই কর্মকর্তা বলেন।
প্রায় দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ হাদিউজ্জামান। তার গবেষণার টেবিলে লাশের পাহাড় দেখতে দেখতে তিনিও এখন ক্লান্ত ও হতাশ। সার্বিক বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে এমন একটা পরিস্থিতি হয়েছে যে, এখানে কেউ নিরাপদে মারা যাবে সেই গ্যারান্টিও দেওয়া যাচ্ছে না। চারদিকে শত শত ঝুঁকি। কেউ সড়কে নামলে তিনি নিরাপদে বাসায় ফিরতে পারবেন কি না, সেই গ্যারান্টি আমরা আসলে দিতে পারছি না।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ