
সেচ কাজে ব্যবহৃত ডিজেলচালিত পানির পাম্পের পরিবর্তে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে কৃষকদের সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজউদ্দীন খানের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।
তাজউদ্দীন খান জানতে চান, সেচ কাজে ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের পরিবর্তে কৃষকদের বিনামূল্যে সৌরবিদ্যুৎ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের আছে কি না।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেসব এলাকায় ডিজেল দিয়ে পানির পাম্প চালানো হয়, সেগুলো আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি উৎস সম্প্রসারণে সরকারের কর্মপরিকল্পনাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা বিবেচনায় আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার। এরই মধ্যে ২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে।
কৌশলপত্র অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০৩০ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বায়ু, বর্জ্য, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সোলার ও অ্যাগ্রিভোলটেইক্সসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন উৎসাহিত করতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রয়োজনীয় পণ্য—সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও স্ট্রাকচার—আমদানিতে শর্তসাপেক্ষে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর অব্যাহতি দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
তিনি বলেন, সর্বশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষ প্রণোদনার অংশ হিসেবে উৎপাদন ব্যয়ের ওপর ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫ অনুসরণ করে যেসব গ্রাহক আগামী বছর ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করবেন এবং নিজস্ব ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, তারা পরবর্তী তিন বছর অর্থাৎ ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাবেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে সরকার বিভিন্ন নীতিমালা ও গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে বলেও সংসদকে জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে ‘পিপিপি পদ্ধতিতে সরকারি সংস্থার মালিকানাধীন ভূমিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প উন্নয়ন নির্দেশিকা, ২০২৬’, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধি নীতিমালা, ২০২৫’, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা, ২০২৫, নেট মিটারিং গাইডলাইন, ২০২৫, জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি, ২০২৫, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবসায়িক মডেল, ‘অনশোর উইন্ড গাইডলাইন’ এবং কার্বন ক্রেডিট প্রক্রিয়াকরণ বিষয়ক গাইডলাইন।
সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সৌরবিদ্যুতের স্টোরেজে ব্যবহৃত ব্যাটারি নিয়েও সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুতের স্টোরেজে বর্তমানে দুই ধরনের ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। এর একটি লেড ব্যাটারি, যা প্রচলিত ব্যবস্থার; অন্যটি লিথিয়াম ব্যাটারি, যা পরিবেশবান্ধব।
লিথিয়াম ব্যাটারির ব্যবহার উৎসাহিত করতে সরকার কাজ করছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, লিথিয়াম ব্যাটারি তৈরির জন্য যেসব কারখানা স্থাপন করা হবে, সেগুলোকে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।
তিনি বলেন, লেড ব্যাটারিতে অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ কারণে লেড ব্যাটারির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে চায় সরকার।
ভবিষ্যতে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাধ্যতামূলকভাবে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকেল সাড়ে ৩টায় সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী প্রথম ৩০ মিনিট ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব।
প্রধানমন্ত্রীর জন্য এদিন আটটি তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন নির্ধারিত ছিল। এর মধ্যে তিনটি প্রশ্ন ও সাতটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ