
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন পাসের মাধ্যমে গুমের ঘটনায় বিচার পাওয়ার সুযোগ আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। নতুন আইনে গুমের একটি স্পষ্ট সংজ্ঞা থাকায় ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচারের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা আটক করার পর তার অবস্থান গোপন করলে, অজ্ঞাত স্থানে রাখলে অথবা আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করলে সেটি গুম হিসেবে গণ্য হবে। তবে কোনো গুমের ঘটনা যদি ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হয়, তাহলে সেটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ ধরনের অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হবে।
চলমান মামলাও যেতে পারে ট্রাইব্যুনালে
নতুন আইনের ৩৩ ধারার বিষয়টি তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর জানান, গুমের কোনো মামলা ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালে চলমান থাকলে তার বিচার সেখানেই অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে সেশন কোর্ট বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চলমান কোনো মামলায় তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়ায় যদি দেখা যায় যে ঘটনাটি ব্যাপক বা পদ্ধতিগত মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, তাহলে সেটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো যাবে।
এমনকি পুলিশের তদন্তের যেকোনো পর্যায়েও কোনো ঘটনাকে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে মামলাটি ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সুযোগ থাকবে। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা কিংবা চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ও অন্য আদালতে চলমান এ ধরনের মামলা ট্রাইব্যুনালে এনে বিচারের উদ্যোগ নিতে পারবে।
তদন্তাধীন অভিযোগ পর্যালোচনা হবে
ট্রাইব্যুনালে ইতোমধ্যে জমা পড়া ও তদন্তাধীন গুমের অভিযোগগুলো নতুন আইনের আলোকে পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব ঘটনা এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স বা ব্যাপক ও পদ্ধতিগত অপরাধের সংজ্ঞার মধ্যে পড়বে, সেগুলোর বিচার ট্রাইব্যুনালে হবে। আর যেসব ঘটনা ওই সংজ্ঞার মধ্যে পড়বে না, সেগুলো স্বতন্ত্র গুমের অপরাধ হিসেবে সংশ্লিষ্ট আদালতে বিচার করা হবে।
তিনি আরও বলেন, আগে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিষয়ে অধ্যাদেশ থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায়নি। ওই আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও সে সময় কমিশন কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও ক্ষতিপূরণে বিধান স্পষ্ট করার প্রয়োজন
বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি ও ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আইন ও রুলস অব প্রসিডিউরে এ বিষয়ে বিধান রয়েছে। তবে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়। এ কারণে রুলস অব প্রসিডিউর সংশোধন করে বিস্তারিত বিধান যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের আপিলের বিষয়েও বক্তব্য দেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১(৩) ধারায় রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার বিধান রয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে গেলে আসামির আপিল গ্রহণযোগ্য নয়।
তার দাবি, আবুল কালাম আযাদের আপিল এখনো গ্রহণ করা হয়নি এবং ৩০ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় তার আর আপিল করার সুযোগ নেই। ফলে ট্রাইব্যুনালের রায় বাস্তবায়ন করা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের সাজা স্থগিত বা কমানোর ক্ষমতা প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় সরকারের এমন ক্ষমতা রয়েছে। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবুল কালাম আযাদকে আপিলের শর্তে আত্মসমর্পণের যে সুযোগ দিয়েছিল, তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর ২১(৩) ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার মতে, কোনো নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বিশেষ আইনের বিধানকে অতিক্রম করা যায় না।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি