অভ্যন্তরীণ ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা: ভালো ঋণগ্রহীতা নির্বাচনে অবশ্যম্ভাবী সংস্কার

কৌশিক আজাদ প্রণয়
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণগ্রহীতার ঋণঝুঁকি মূল্যায়নে বর্তমানে ব্যবহৃত অন্যতম কাঠামো হলো অভ্যন্তরীণ ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা (Internal Credit Risk Rating - ICRR)। ২০১৯ সালে পূর্ববর্তী CRG ব্যবস্থা বিলুপ্তির পর থেকে এই কাঠামোটি ঋণগ্রহীতার ঋণযোগ্যতা নিরূপণের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কাঠামোগতভাবে, মোট স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৬০ নম্বর নির্ধারিত হয় পরিমাণগত বিশ্লেষণের (Quantitative Analysis) জন্য এবং ৪০ নম্বর গুণগত বিশ্লেষণের (Qualitative Analysis) জন্য। স্বাভাবিক অবস্থায়, কোনো গ্রাহককে গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করতে হলে পরিমাণগত অংশে ন্যূনতম ৫০% স্কোর অর্জন করা বাধ্যতামূলক।
শিথিলতা ও সংকট
ICRR-এর প্রাথমিক সার্কুলার অনুযায়ী, মোট স্কোর ৬০-এর নিচে থাকলে সেটিকে অগ্রহণযোগ্য, ৬০ থেকে ৭০-এর নিচে সীমান্তবর্তী (Marginal), ৭০ থেকে ৮০-এর নিচে ভালো (Good) এবং ৮০ বা তার উপরে চমৎকার (Excellent) হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু, কোভিড–১৯ মহামারি এবং পরবর্তী বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়লে, বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণঝুঁকি মূল্যায়নে ক্রমবর্ধমান শিথিলতা আনে।
২০২১ সালের সার্কুলার: পরিমাণগত অংশের ন্যূনতম প্রাপ্তি ৪৫% করা হয় এবং শ্রেণিভিত্তিক সীমা ৫ পয়েন্ট করে কমানো হয়।
২০২২ সালের সার্কুলার: আরও ছাড় দিয়ে ন্যূনতম প্রাপ্তি ৪০% নির্ধারণ করা হয় এবং শ্রেণিভিত্তিক সীমা আরও ৫ পয়েন্ট হ্রাস করা হয়।
এই অতিরিক্ত শিথিলতার ফলে, এমনকি অগ্রহণযোগ্য ICRR স্কোর থাকা সত্ত্বেও কোনো গ্রাহকের ঋণ নবায়ন বা বর্ধিতকরণ দুই বছর পর্যন্ত অনুমোদনযোগ্য ছিল। এই ধরনের ছাড় নিঃসন্দেহে ব্যাংকের ঋণপোর্টফোলিওতে ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়েছিল, যা গত কয়েক বছরে দেশের ব্যাংকিং খাতে অবলোপনযোগ্য ঋণ (Non-Performing Loan – NPL) এর উদ্বেগজনক বৃদ্ধির একটি অন্যতম কারণ। দুর্বল ঋণমূল্যায়ন প্রক্রিয়া ভালো ঋণগ্রহীতা নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিয়েছিল।
সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
যদিও কোভিড–১৯ এবং রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ব্যবসায়িক ক্ষতি মোকাবেলায় এই শিথিলতা সাময়িকভাবে প্রয়োজন ছিল, কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই উন্নতির পথে। দেশের অর্থনীতি যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে, তখন ব্যাংকিং খাতের সুস্থতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কঠোর ঋণমূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি।
২০২৫ সালের আগস্টে, বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন একটি সার্কুলার জারি করে ICRR কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে—অগ্রহণযোগ্য স্কোর প্রাপ্ত গ্রাহককে ঋণ সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো স্বতন্ত্র বিবেচনা (own discretion) প্রয়োগ করতে পারবে, তবে এর যৌক্তিকতা ও প্রাসঙ্গিক সূচকসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিপোর্ট করতে হবে। এটি কিছুটা ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও, কাঠামোগত সংস্কার আরও জরুরি।
প্রস্তাবিত সংস্কার: নির্ভুল ঝুঁকি মূল্যায়ন
ঋণঝুঁকি প্রশমনে ICRR কাঠামোটিকে আরও কার্যকর ও নির্ভুল করার জন্য নিম্নোক্ত সংস্কারগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:
পরিমাণগত বিশ্লেষণের স্কোর বৃদ্ধি: ঝুঁকি মূল্যায়নের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত পরিমাণগত বিশ্লেষণ। তাই, গুণগত বিশ্লেষণের অংশটি ৪০ থেকে কমিয়ে ৩০ করা এবং পরিমাণগত বিশ্লেষণের অংশ ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৭০ করা উচিত।
ন্যূনতম স্কোর বৃদ্ধি: পরিমাণগত অংশে ন্যূনতম প্রাপ্তি পুনরায় ৪৫% স্কোর অর্জন করা বাধ্যতামূলক করা উচিত।
নতুন সূচক অন্তর্ভুক্তি: ঋণঝুঁকি মূল্যায়নে কেবল প্রচলিত পরিমাণগত সূচক (যেমন লিভারেজ, লিকুইডিটি, প্রফিটেবিলিটি, কভারেজ, অপারেশনাল দক্ষতা, Earning Quality) এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে শেয়ারবাজারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক—Earnings Per Share (EPS) এবং Price–Earnings (P/E) Ratio—অন্তর্ভুক্ত করা হলে ঝুঁকি মূল্যায়ন আরও নির্ভুল হবে। বিশেষত তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এই সূচকগুলো গ্রাহকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা ও বাজারের দৃষ্টিতে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে সহায়তা করবে।
একটি সংস্কারকৃত ও কঠোর ICRR কাঠামো ব্যাংকগুলোকে প্রকৃত যোগ্য ঋণগ্রহীতা বাছাইয়ে সহায়তা করবে। এতে করে NPL হার হ্রাস পাবে, ঋণের গুণগত মান উন্নত হবে এবং বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আরও স্থিতিশীল ও টেকসই হবে। ভালো ঋণগ্রহীতা নির্বাচনে এই সংস্কার এখন অবশ্যম্ভাবী।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
(লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)