দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র—বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—শুধু ভৌগোলিকভাবে নয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও মানবিক বাস্তবতায়ও বহু শতাব্দী ধরে সংযুক্ত। আরাকান থেকে চট্টগ্রাম, রাখাইন জনগোষ্ঠী থেকে রোহিঙ্গা, বৌদ্ধ-ইসলামিক সাংস্কৃতিক বিনিময় থেকে ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে সম্পর্কের ভিত্তি এক সময় ছিল ঘনিষ্ঠ, যদিও আজ তা একটি উত্তপ্ত ও অস্থির দ্বিপাক্ষিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ইস্যু—রোহিঙ্গা সংকট। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পরিচালিত নির্যাতন ও গণহত্যার অভিযোগের মুখে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশের কক্সবাজার সীমান্তে আশ্রয় নেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ ঘটনাকে ‘জাতিগত নিধন’ বলে আখ্যায়িত করলেও মিয়ানমারের পক্ষ থেকে বরাবরই অস্বীকৃতি ও প্রতিরোধ লক্ষ্য করা গেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: সহাবস্থানের সময়কাল
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার সম্পর্ক একেবারেই নতুন নয়। প্রাচীনকালে আরাকান রাজ্যের সঙ্গে বাংলা উপকূলীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল নিবিড়। মুসলিম শাসনের সময় আরাকানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চাও ছিল প্রবল। এমনকি অনেক রাখাইন জনগোষ্ঠী আজও কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করছে, যারা ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে শিকড় গেড়েছে।
ব্রিটিশ উপনিবেশিক আমলেও দুদেশ একযোগে শাসিত হয়েছিল, ফলে জনগণের মধ্যে স্থানান্তর ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ছিল স্বাভাবিক। ১৯৪৭ এবং ১৯৭১—এই দুটি বিভাজনের পরেও সীমান্তজুড়ে মানুষের চলাচল বন্ধ হয়নি।
রোহিঙ্গা সংকট: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন নতুন কিছু নয়। ১৯৭৮ ও ১৯৯১ সালেও মিয়ানমার থেকে বহু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের আগস্টে যা ঘটেছে, তা ছিল ভয়াবহতা ও ব্যাপকতার দিক দিয়ে নজিরবিহীন। বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালনে সাড়া দিয়ে উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দিলেও সময় যত গড়িয়েছে, ততই এ ইস্যু হয়ে উঠেছে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বোঝা।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আজও কার্যকর অগ্রগতি নেই। মিয়ানমার সরকার নানা চুক্তি করেও সেগুলো বাস্তবায়নে অনাগ্রহী থেকেছে। আন্তর্জাতিক আদালতেও দায় অস্বীকার করেছে দেশটি।
বর্তমান বাস্তবতা: উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বারবার গোলাগুলি, মর্টার শেল পড়া, এবং বিমান চলাচল উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ সরকার শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক সমাধান চাইলেও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি—বিশেষ করে জান্তা সরকারের উদারনীতি হীন মনোভাব—এই আলোচনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, মানব পাচার ও চরমপন্থার ঝুঁকি বাড়ার মতো উদ্বেগজনক চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে।
সমাধানের পথ কী?
সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন দুই রাষ্ট্রের পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে আলোচনায় ফিরে আসা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমার সরকারের ওপর আরও কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে হবে যেন তারা রোহিঙ্গা জনগণকে নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে স্বদেশে ফেরত নিতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখন সময় এসেছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মঞ্চে রোহিঙ্গা সংকটকে আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করার। ভারতের মতো প্রতিবেশী এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
উপসংহার
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক শুধুই অতীতের গৌরবগাথা নয়—এটি ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ভিত্তিও হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে তখনই, যখন দুই দেশ সংঘাত নয়, আস্থার পথে হাঁটবে। রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক সমস্যা নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব—যার সমাধান ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় টেকসই শান্তি অধরা থাকবে।
লেখক: আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং গবেষক
(লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)