
টাকার বিপরীতে ডলারের দ্রুত দরপতন ঠেকাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীল সিগন্যাল রেট বজায় রাখতে এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে চার দফায় মোট ৫৩৯ মিলিয়ন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা এই কৌশলগত পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার নিলামের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ১২১.৩৫ থেকে ১২১.৫০ টাকা দরে ৪৫ মিলিয়ন ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে ২৩ জুলাই ১২১.৯৫ টাকা কাট-অফ রেটে ১০ মিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছিল, যা বর্তমান রেটের চেয়ে অন্তত ৪৫ বেসিস পয়েন্ট বেশি।
এই নিলাম প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৩ জুলাই, যখন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ব্যাংক নিলামে ১২১.৫০ টাকা দরে ১৭১ মিলিয়ন ডলার কিনে। ১৫ জুলাই একই দামে আরও ৩১৩ মিলিয়ন ডলার কেনা হয়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হস্তক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য—ডলারের হঠাৎ দরপতন রোধ এবং বাজারে স্থিতিশীল বিনিময় হার নিশ্চিত করা।
একজন ঊর্ধ্বতন নিলাম কমিটি কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকগুলো প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার বিক্রির প্রস্তাব দিলেও, বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলারই কেনা হয়েছে। তার মতে, বিনিময় হার অতিরিক্ত কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া উভয়ই অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর, তাই রপ্তানি ও রেমিট্যান্স খাতের স্বার্থে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি।
এক শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বর্তমানে ব্যাংক খাতে চাহিদার তুলনায় বেশি ডলারের প্রবাহ রয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ২.৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স ও ৪ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের বিপরীতে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত আমদানি কমে গিয়ে মাসিক বিল দাঁড়িয়েছে ৪–৪.৫ বিলিয়ন ডলারে। ফলে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে ডলারের দাম কমছে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজার থেকে ডলার কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের সিইও নাসের এজাজ বিজয় মনে করেন, নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনা রেমিট্যান্স প্রবাহকে বৈধ চ্যানেলে উৎসাহিত করছে এবং রপ্তানির প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে সাহায্য করছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাপী অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের বাজার হস্তক্ষেপ করে থাকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য।
নাসের সতর্ক করেন, বিনিময় হার হঠাৎ কমে গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস পায় এবং হুন্ডির মতো অবৈধ চ্যানেল সক্রিয় হয়ে ওঠে। একইভাবে, রপ্তানিকারকেরা ফরওয়ার্ড-লুকিং রেট ধরে মূল্য নির্ধারণ করায় অপ্রত্যাশিত দরপতন তাদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়। তাই উভয় খাতের জন্য বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনও মনে করেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার এখনো পর্যাপ্ত পরিপক্ব নয় যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি ছাড়া চলতে পারে। তার মতে, ডলারের রেট বেশি থাকলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি খাত লাভবান হয়, আর বেশি কমে গেলে আমদানি চাহিদা বাড়ে—তাই ভারসাম্য বজায় রাখা একটি ভালো মুদ্রানীতির অংশ।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ