
সংগৃহীত ছবি
দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অগ্রযাত্রা কার্যত থমকে গেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর নানা উদ্যোগ ও পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে বাড়ছে না কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা। গত এক বছরে এ খাতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মাত্র ৫৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা। এর প্রায় পুরোটাই এসেছে সৌরবিদ্যুৎ থেকে। বায়ুশক্তি ও বায়োমাস খাতে অগ্রগতি এখনো প্রায় শূন্যের কোঠায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নীতিগত অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগে আস্থার সংকট এবং দীর্ঘসূত্রতা। ফলে সম্ভাবনাময় এ খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে সংকটে ফেলেছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এতে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি চলমান বিনিয়োগ পরিকল্পনাও বাধার মুখে পড়েছে।
সোলার ইপিসি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এজাজ আল কুদরত এ মাজিদ বলেন, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে কম দামের নিম্নমানের প্যানেলের পরিবর্তে উন্নত মানের সৌর প্যানেল ও যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সৌরবিদ্যুতেই সক্ষমতা বৃদ্ধি
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ডেটাবেজের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবর শেষে দেশে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১২৮ মেগাওয়াটে। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ৮৩৫ মেগাওয়াট। জলবিদ্যুৎ থেকে ২৩০ মেগাওয়াট এবং বায়ুশক্তি থেকে ৬২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে বায়োগ্যাস ও বায়োমাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এক মেগাওয়াটেরও কম।
এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের অক্টোবর শেষে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ১ হাজার ৫৫০ মেগাওয়াট। ওই সময় সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ছিল ১ হাজার ২৫৬ মেগাওয়াট। জলবিদ্যুতের সক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াটে অপরিবর্তিত ছিল। বাকি সামান্য অংশ এসেছিল বায়ুশক্তি, বায়োগ্যাস ও বায়োমাস থেকে। অর্থাৎ এক বছরে যে সক্ষমতা বেড়েছে, তার প্রায় পুরোটাই সৌরবিদ্যুৎনির্ভর।
বিনিয়োগে আস্থার সংকট
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নীতিগত সহায়তার অভাব এবং সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা না থাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া কয়েকটি সিদ্ধান্ত উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তাদের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ৩৪টি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া লেটার অব ইনটেন্ট বা এলওআই বাতিল করে। যেসব প্রকল্প ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছিল, সেগুলোর উদ্যোক্তাদেরও নতুন করে ট্যারিফ বা বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের আলোচনায় বসতে হয়। পাশাপাশি প্রকল্পগুলোর বিপরীতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির সুবিধাও প্রত্যাহার করা হয়। উদ্যোক্তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতির স্থায়িত্ব ও সরকারের প্রতিশ্রুতির নির্ভরযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে নতুন বিনিয়োগ আসা কঠিন।
দরপত্রেও মিলছে না সাড়া
নীতিগত অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে সরকারের নতুন প্রকল্পের দরপত্রেও। ৬ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট সক্ষমতার নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে বড় পরিসরে দরপত্র আহ্বান করা হলেও দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা ও প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ (ইপিসি) প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) কয়েক দফায় দরপত্র জমা দেওয়ার সময় বাড়ালেও আশানুরূপ ফল মেলেনি।
সমন্বিত পরিকল্পনা ও নীতিসহায়তার তাগিদ
এলিনোর সোলার সলিউশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান এম শরিফ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, দুই-তিন দশক আগেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে তেমন আলোচনা ছিল না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং দেশের ৩৫ থেকে ৩৬ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ জ্বালানি আমদানি ও ভর্তুকিতে ব্যয় হওয়ায় সরকার এ খাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে বাধ্য হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার কিছু ইতিবাচক নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এ খাতের বিকাশে আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্য সামনে রয়েছে। অথচ ভারত ও পাকিস্তান এ ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ অর্জন করলেও বাংলাদেশ এখনো ৫ শতাংশের নিচে। ফলে এ খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা জরুরি।
এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স বা বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন তিনি। তাঁর মতে, এতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ), উদ্যোক্তা, কারিগরি ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রসারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নীতি ও বিশেষ সাধারণ আদেশ (এসআরও) আরও স্পষ্ট, সহজ ও উদ্যোক্তাবান্ধব করতে হবে। কোনো নীতি বা এসআরও জারির আগে উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএসআরইএর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা উচিত। এতে নীতি বাস্তবায়নের জটিলতা ও পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট সমস্যা এড়ানো সম্ভব হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) নিবন্ধন প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করার তাগিদ দেন তিনি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত টিয়ার-১ পর্যায়ের শীর্ষ ১০টি প্রতিষ্ঠানের সৌর প্যানেল ও ইনভার্টার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকাভুক্তির ব্যবস্থা করা গেলে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সময় কমবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়বে।
এ খাতের টেকসই সম্প্রসারণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন এম শরিফ উদ্দিন ভূঁইয়া। তাঁর মতে, সৌরবিদ্যুতের সুবিধা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দ্রুত দক্ষ কর্মী তৈরি করতে হবে।
অর্থায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার ও অতিরিক্ত জামানতের শর্ত এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা। এসব শর্ত সহজ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম আমদানিতে বিদ্যমান ১ শতাংশ শুল্ক-ভ্যাট সুবিধার মেয়াদ, যা ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা, অন্তত আরও এক বছর বাড়ানো দরকার। এতে বিনিয়োগ ব্যয় কমবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হবে।
পুঁজিবাজার হতে পারে অর্থায়নের নতুন উৎস
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশে দেশের পুঁজিবাজারকে অর্থায়নের নতুন উৎস হিসেবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। এ খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি ও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে এ অর্থায়ন নিশ্চিত করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে গ্রিন বন্ড, গ্রিন সুকুক, অবকাঠামো বিনিয়োগ তহবিল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোম্পানির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা যেতে পারে।
বিশেষ করে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে গ্রিন বন্ড কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ একত্র করে বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড ব্যবহার করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোম্পানিগুলো প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশগত লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে যুক্ত অর্থায়নে সাসটেইনেবিলিটি-লিংকড বন্ডও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাফারি ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এ রাজ্জাক বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রসারে উচ্চ শুল্ক দীর্ঘদিন ধরে বড় অন্তরায় ছিল। সরকার শুল্ক কমিয়ে এনেছে, যা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এ খাতের টেকসই বিকাশে এখন প্রধান বাধা তহবিলের সংকট। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত তহবিল ও সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দেশের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিদ্যুৎ খাতে লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিকল্প নেই। এ জন্য নীতির ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার জরুরি। অন্যথায় বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।