
সংগৃহীত ছবি
ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে মিয়ানমারের দশজন বিদ্রোহী নিহত হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা ভেঙে পড়েছে। এর ফলে সীমান্ত অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে ভারতীয় ভূখণ্ডে আশ্রয় নেওয়া হাজার হাজার শরণার্থীর মধ্যে।
নিহতদের মধ্যে তিনজন ছিলেন কিশোর। এরা সবাই পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস (পিডিএফ)-এর অংশ ‘পা কা ফা’ (PKP)-এর সদস্য। পিডিএফ হলো মিয়ানমারের নির্বাসিত সরকার ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট’ (NUG)-এর প্রতিরোধ বাহিনী, যেটি ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আইনপ্রণেতাদের নিয়ে গঠিত।
ভারতের দাবি বনাম মিয়ানমারের পাল্টা অভিযোগ
ভারতের সেনাবাহিনী জানায়, ১৪ মে মনিপুর রাজ্যের চান্দেল জেলায় সীমান্ত টহলের সময় "সন্দেহভাজন বিদ্রোহী"দের সঙ্গে গুলিবিনিময়ে তারা ১০ জনকে হত্যা করেছে। নিহতদের কাছ থেকে “যুদ্ধসামগ্রী” এবং একে-৪৭ রাইফেল ও রকেট লঞ্চার উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
তবে মিয়ানমারের নির্বাসিত সরকার (NUG) পাল্টা অভিযোগ করে বলেছে, বিদ্রোহীরা ভারতের ভূখণ্ডে গুলিবিনিময়ে নিহত হননি। বরং তারা আটক হওয়ার পর নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।
চার বছরের নীরব সমঝোতা ভাঙলো এবার
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের ১,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে এক ধরনের নীরব সমঝোতা চলে আসছিল। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো সীমান্ত অতিক্রম করলেও ভারতীয় বাহিনী সাধারণত হস্তক্ষেপ করত না। কিন্তু তামু এলাকায় এসব হত্যাকাণ্ডে সেই সমঝোতা ভেঙে পড়েছে।
বিদ্রোহীরা জানায়
স্থানীয় পিপলস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন টিমের কর্মী থিদা (ছদ্মনাম) জানান, নিহতদের জানাজা এবং দাহের আয়োজন তিনি করেন। তিনি বলেন, “লড়াকুরা আতঙ্কে থাকলেও সবচেয়ে বেশি ভয়ে রয়েছে শরণার্থীরা। সবাই এখন নিজেদের অনিরাপদ মনে করছে।”
তিনি আরও বলেন, “চান্দেল সীমান্তে ভারতীয় বাহিনী আমাদের ক্যাম্প সম্পর্কে আগেই জানত। কিন্তু তারপরও এমন ঘটনা ঘটল।”
ভারতের বক্তব্যে অসামঞ্জস্য
ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বারবার বিবৃতি বদলানো হয়েছে। প্রথমে বলা হয়, তারা “গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান” চালিয়েছে। পরে বলা হয়, তাদের টহলদল “হামলার শিকার” হয়েছিল এবং “প্রতিরোধ হিসেবে গুলি চালানো হয়”। এরপর আবার জানানো হয়, নিহতরা সীমান্ত বেড়া নির্মাণে বাধা দিতে চেয়েছিল।
ভারতের এক সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা আল জাজিরাকে বলেন, “এই হত্যাকাণ্ড একটি ভুল হিসেব বা যুদ্ধকালীন বিভ্রান্তির ফল হতে পারে।”
বর্ডার ফেন্সিং ঘিরে উত্তেজনা
সীমান্ত হত্যা ও চলমান সীমান্তে বেড়া নির্মাণ নিয়ে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। নিহতদের মরদেহ ফেরত নিতে গেলে ভারতীয় বাহিনী “মিথ্যা তথ্য লেখা কাগজে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে”—এমন অভিযোগ করেছেন মিয়ানমারের কর্মকর্তারা।
সীমান্ত বেড়া নিয়ে গবেষক অংশুমান চৌধুরী বলেন, “ভারতের এই পদক্ষেপ বহু দশকের সীমান্ত সম্পর্ককে একেবারে নতুন এক অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিচ্ছে।”
মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মনিপুর ও অরুণাচল প্রদেশের বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী দুই দেশের সীমান্তের দুই পাশে বাস করে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। ফেন্সিং তাদের ঐতিহ্যগত চলাচলে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সংকট আরও বাড়বে?
মিয়ানমার ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিশেষজ্ঞ আংশুমান চৌধুরী বলেন, “এই হত্যাকাণ্ড খুবই বিস্ময়কর। এটি যে হয়নি এতদিন, তা কোনো কাকতাল নয়। সীমান্তে সহনশীলতা থাকলেও এই হত্যাকাণ্ড তা ভেঙে দিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই ঘটনা নতুন উত্তেজনার জন্ম দেবে। অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলিও নজর রাখছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।”
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ