
# দুইধাপে কর্মসূচিতে দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে জনমত গড়ার টার্গেট
# রমজানের আগেই ঢাকাসহ সারা দেশে সমাবেশ করবে
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের ৬ মাসের মাথায় রাজপথে নামতে যাচ্ছে বিএনপি। জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির আদলে মূল দাবি থাকবে দ্রুত নির্বাচন। দুই ধাপের এই কর্মসূচির মধ্যে রমজানকে সামনে রেখে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে প্রথমে হবে বিক্ষোভ সভা। দেশে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুততম সময়ে সুষ্ঠু সংসদ নির্বাচনের দাবিতে হবে দ্বিতীয় কর্মসূচি।
বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে ছাত্রদের খসড়া ঘোষণাপত্র পুনর্বিন্যাস (সংশোধন) করেছে বিএনপি। এগুলো চূড়ান্ত হতে পারে। এরপর সংশোধনকৃত খসড়া ও আন্দোলনের পক্ষে মতামত নিতে যুগপতের আন্দোলনে থাকা শরিকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বিএনপি। শরিকদের সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে গতকাল শুক্রবার বিকেলে গুলশানে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি নেতারা। বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান এ তথ্য জানান।
বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ১২ দলীয় জোট নেতাদের মধ্যে মোস্তফা জামাল হায়দার, শাহদাত হোসেন সেলিম, নুরুল আমিন বেপারী, ফারুক রহমান, সৈয়দ এহসানুল হুদা, রাশেদ প্রধান, শামসুদ্দিন পারভেজ, আব্দুর করিম এবং আবুল কাশেম উপস্থিত ছিলেন। আজ লিয়াঁজো কমিটি বৈঠক হবে বিকাল ৪ টা জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট ও সন্ধ্যা ৬ টা ৩০ মিনিট এলডিপির সঙ্গে বৈঠক করবেন লিয়াঁজো কমিটি প্রধান বিএনপি স্থায়ী কমিটি সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
দলীয় সূত্রমতে, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে দ্রুত নির্বাচনের জন্য বিএনপি যে দাবি জানিয়ে আসছিল, সে লক্ষ্যে অন্তর্র্বতী সরকারকে চাপে রাখতে দ্বিতীয় কর্মসূচি পালন করবে। দুই ইস্যুতেই রমজানের আগেই ঢাকাসহ সারা দেশে সমাবেশ করবে দলটি। শিগগিরই বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে কর্মসূচির সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হবে। অন্তর্র্বতী সরকারের মেয়াদের ৬ মাসের মাথায় এই প্রথম কোনো কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামতে যাচ্ছে বিএনপি। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ৮ আগস্ট শপথ নেয় অন্তর্র্বতী সরকার। এরপর থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে দ্বিমত পোষণ করলেও মোটা দাগে সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে বিএনপি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমাদের কর্মসূচি চলমান। শীতবস্ত্র বিতরণ, আন্দোলনে আহতদের পুনর্বাসন এবং মহানগর থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ে রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফা কর্মসূচি আমরা পালন করছি। গত ১৬ বছর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকার পতনের জন্য আমরা আন্দোলন করেছি। ছাত্রদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন হয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্র এখনও ফিরে পায়নি জনগণ। আমরা মনে করি, অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে পারলে এই সরকার কেন আগামী ৬ মাসের মধ্যে পারবে না? সরকারের ইচ্ছা থাকলে জুলাই-আগস্টের মধ্যে নির্বাচন দেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, অন্তর্র্বতী সরকার চাইলে কোনো আইন পরিবর্তন বা সংবিধানের ধারা-উপধারা পরিবর্তন করতে পারে না। তারা অধ্যাদেশ জারি করতে পারে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার এসে তা বাস্তবায়ন করে থাকে। তাই আগামীতে জনগণের নির্বাচিত পার্লামেন্ট যুগের চাহিদা অনুযায়ী সংসদে আইনের ধারা-উপধারা পরিবর্তন বা সংশোধন করবে। অন্তর্র্বতী সরকার বা ছাত্ররা প্রক্লেমেশনও (ঘোষণাপত্র) দিতে পারে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, গত কয়েক মাস ধরে ন্যূনতম সংস্কার করে একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে নির্বাচনমুখি প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপি। দলটি মনে করে, চলতি বছরের জুলাই-আগস্টের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব এবং এ বিষয়ে তাদের অবস্থানও ইতিমধ্যে তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে অন্তর্র্বতী সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে যে কোনো সময় সংসদ নির্বাচন হতে পারে। তবে বিএনপি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়কে নির্বাচনের জন্য ‘খুবই অতিরিক্ত সময়’ বলে মনে করছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ন্যূনতম সংস্কার করে একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জুলাই-আগস্টেই সম্ভব। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৯০ দিনে করতে পারলে অন্তর্র্বতী সরকার কেন পারবে না? আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, এখন যা হচ্ছে তা নির্বাচন পেছানোর পাঁয়তারা। এটা জনগণ মেনে নেবে না। আমরাও মানব না।
সূত্র আরও জানায়, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বৈষম্য বিরোধী ছাত্রদের জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ছাত্ররা বিএনপির কাছে ওই ঘোষণাপত্রের যে খসড়া পাঠিয়েছে, সেটা নিয়ে বিএনপি নেতারা আলোচনা করেছেন।
সেখানে কী কী ধরনের পরিমার্জন, পরিবর্ধন আনা যায়, সেগুলো নিয়ে দলের ভেতরে কাজ চলছে। এই ঘোষণাপত্রের প্রণয়ন নিয়ে বিএনপির প্রশ্ন থাকলেও ছাত্রদের এই উদ্যোগকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করতে চায় না। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এই ঘোষণাপত্রের কোথায় কোথায় পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া যায়, সেটা তারা করবে। খসড়া ঘোষণাপত্র নিয়ে ছাত্রদের পক্ষ থেকে বাহাত্তরের সংবিধানের মূলনীতি বাতিলের বিষয়ে যে কথা বলা হচ্ছে, সেটি যুক্তিসঙ্গত নয় বলে মনে করছে দলটি।
বৈঠকে অংশ নিয়ে স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, মুক্তিযুদ্ধই হবে বাংলাদেশের ভিত্তি এরপরে বাংলাদেশের আরও অনেক অর্জন রয়েছে। এগুলো রেখেই ঘোষণাপত্র তৈরি করতে হবে। ছাত্ররা এটাকে যে ব্যাকডেটেড প্রক্লেমেশন আকারে দেওয়ার যে কথা বলছে, সেভাবে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও মনে করেন তারা। ছাত্রদের খসড়া ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, এটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে কার্যকর বলে ধরে নেওয়া হবে। তবে এটা এভাবে দেওয়ার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে করে না বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। তাদের অভিমত, এটা অপ্রয়োজনীয়। এটাকে ডিক্লারেশন আকারে দিতে হবে। আর যখন এটা নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হবে, তখন এটা ঘোষিত হয়েছে বলে গণ্য হবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমআর