প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

ভারতের গণতন্ত্র, নির্বাচনব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন বিরোধী দল, ছাত্রসংগঠন ও বিভিন্ন আন্দোলনকারী। তাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এ নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে মৃত ভোটার, অন্যত্র চলে যাওয়া ব্যক্তি এবং যাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি—এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের দাবি, প্রক্রিয়াটির উদ্দেশ্য ভোটার তালিকা থেকে অনুপযুক্ত ও পুনরাবৃত্ত নাম বাদ দেওয়া; ভুলভাবে বাদ পড়া ভোটারেরা পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করতে পারবেন। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় তাঁদের সমর্থক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর অসম প্রভাব পড়তে পারে। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন অবশ্য পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ভারতে গণতন্ত্রের অবস্থা নিয়ে এই বিতর্ক শুধু ভোটার তালিকায় সীমাবদ্ধ নয়। বিরোধীদের অভিযোগ, বিক্ষোভের অনুমতি, সাংবাদিকদের কাজের স্বাধীনতা এবং সরকারের সমালোচনা করার অধিকার নিয়েও চাপ তৈরি হচ্ছে। কৌতুকশিল্পী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কুনাল কামরার পডকাস্ট এবং বামপন্থি ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) নেত্রী নেহা বোরার বক্তব্যেও বিজেপির রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা উঠে এসেছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও গণতন্ত্র ও নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। এদিকে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীদের আটক এবং দিল্লিতে বিক্ষোভের স্থানে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনায় নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তবে বিজেপির বক্তব্য, বিরোধীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও দলটির রাজনৈতিক শিকড় ভারতীয় জনসংঘ ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সঙ্গে যুক্ত। হিন্দুত্ববাদী আদর্শ, জাতীয়তাবাদ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দলটির রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ২০২৪ সালে বিজেপি জোটের শরিকদের সঙ্গে সরকার গঠন করে। সমালোচকদের মতে, ক্ষমতায় থাকার সময়ে দলটির কিছু নীতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অন্যদিকে বিজেপির সমর্থকেরা দলটির উন্নয়নমূলক কর্মসূচি ও নির্বাচনী সাফল্যকে সমর্থনের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। ফলে বিজেপি ভারতের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি জনপরিসরেও বিস্তৃত। তবে এ বিতর্কের চূড়ান্ত মূল্যায়নে ভোটার তালিকা সংশোধনের তথ্য, নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা, আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা—সবকিছুই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি