
পাবনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির উপদেষ্টা ও সাবেক কার্যকরী সদস্য প্রকৌশলী ড. মুহাম্মদ ঈসমাইল হোসেনের জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের রাজশাহী বিভাগীয় আহ্বায়ক পদ পাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত থাকা এবং সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাওয়ার অভিযোগের মধ্যেই বিএনপির সহযোগী সংগঠনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ও মনোনয়ন চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঈসমাইল হোসেন। তাঁর অতীত রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে আগে জানা ছিল না বলে জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
দলীয় সূত্র ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন ড. মুহাম্মদ ঈসমাইল হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-৫ (সদর) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে তিনি প্রচার-প্রচারণা চালান এবং মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। বর্তমানে তিনি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের ৩ নম্বর সদস্য হিসেবে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের পদে থাকা অবস্থায় পদত্যাগ না করেই বিএনপির সহযোগী সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সদস্য হিসেবে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেছেন দলটির উপদপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাবিত ফয়সাল রিজভী।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) পাবনা জেলা পরিষদে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত উত্তরবঙ্গীয় মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ড. মুহাম্মদ ঈসমাইল হোসেন। জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের রাজশাহী বিভাগীয় আহ্বায়ক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করেই নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
বিএনপি নেতাদের প্রতিক্রিয়া
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ঈসমাইল হোসেনের মুক্তিযোদ্ধা দলের বিভাগীয় পদ পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা বিএনপির নেতারা। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নূর মোহাম্মদ মাসুম বগা ‘স্বদেশ প্রতিদিন’-কে বলেন, ‘গত ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। দলে আওয়ামী লোকজনের অনুপ্রবেশ রোধে আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। এরপরও ঈসমাইল সাহেব কীভাবে এই দলে এলেন, আমার জানা নেই। আমি দলীয় ফোরামে বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করব।’
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবিএম ফজলুর রহমান বলেন, ‘সমাজে এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী থাকে, যারা সব সময় ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে সুবিধা নিতে চায়। এদের মূলত কোনো আদর্শিক জায়গা নেই। যিনি জেলা আওয়ামী লীগের রানিং কমিটির উপদেষ্টা এবং দলের মনোনয়নপ্রার্থী ছিলেন, তিনি বিএনপির মতো একটি দলের বিভাগীয় পদে কীভাবে আসীন হলেন—এটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।’
অন্যদিকে, পাবনা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মাসুদ খন্দকার বলেন, মুহাম্মদ ঈসমাইলকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না এবং তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কেও অবগত নন। অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দলের ফোরামে জানাবেন।
অভিযোগ অস্বীকার ঈসমাইলের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শুরুতে উত্তেজিত হয়ে পড়েন ড. মুহাম্মদ ঈসমাইল হোসেন। এ সময় তিনি মামলার হুমকিও দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তিনি নিজের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের পক্ষে দাবি করে বলেন, ‘আমার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কারও নেই। আমি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা।’
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কে বা কারা পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সদস্যের তালিকায় আমার নাম দিয়েছিল। আমি বিষয়টি জানার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। ২০২৩ সালের পর থেকে আমি আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে নেই। মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়।’
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস কেন্দ্রীয় সভাপতির
বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরে আসার পর জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত জানিয়েছেন, ঈসমাইল হোসেনের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তাঁদের জানা ছিল না।
তিনি বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ঈসমাইলের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় আমাদের জানা ছিল না। বিষয়টি একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তাঁর এই রাজনৈতিক পরিচয় এবং মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা প্রমাণিত হলে মুক্তিযোদ্ধা দলে এটিই হবে তাঁর শেষ দায়িত্ব। তাঁকে আর এই সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করতে দেওয়া হবে না। ঢাকায় পৌঁছেই তাঁর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা ও পদ বাতিলের নোটিশ ইস্যু করা হবে।’
তবে ঈসমাইল হোসেনের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার দাবি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর বর্তমান সম্পর্ক এবং মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি