
ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর সরকারকে প্রতিবছর বাজেট থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তাঁর দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার সময় তিনি দেখেছেন, ব্যাংক খাতের এক-তৃতীয়াংশ অর্থ চুরি হয়ে গেছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ইউআইইউ) ওয়ান ব্যাংকের আয়োজনে ‘বাংলা কিউআর’ লেনদেনের প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গভর্নর বলেন, ‘আমি যখন গভর্নরের দায়িত্ব নিয়েছি, তখন এক-তৃতীয়াংশ টাকা চুরি হয়ে গেছে। ব্যাংক খাতের এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর সরকারকে প্রতিবছর বাজেট থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা করে দিতে হবে।’
এই অর্থের পরিমাণ বোঝাতে তিনি বলেন, ‘এই অর্থ দিয়ে সরকার চাইলে দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারত। এমনকি কোটি পরিবারকে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়াও সম্ভব হতো।’
ব্যাংক খাতের অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘লুটেরারা জনগণের টাকা নিয়ে গেছে। এটাকে শুধু চুরি না, তারা লুট করেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।’
‘বাংলা কিউআর’ থেকে রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, সরকার সাধারণত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও আয়কর থেকে রাজস্ব পায়। দেশে ‘বাংলা কিউআর’ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা গেলে সরকারের বার্ষিক আয় দুই লাখ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, ‘বাংলা কিউআর’-এর মূল উদ্দেশ্য দেশের ১৮ কোটি মানুষের লেনদেন সহজ করা। এর মাধ্যমে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব ফাঁকিও কমবে।
অনুষ্ঠানে ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান বলেন, দৈনন্দিন জীবনে আর্থিক সেবা আরও সহজ ও সহজলভ্য হলেই ডিজিটাল রূপান্তর অর্থবহ হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, ইউআইইউতে ‘বাংলা কিউআর’ চালুর ফলে শিক্ষার্থীরা সরাসরি আন্তঃপরিচালনযোগ্য ডিজিটাল লেনদেন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা পাবেন। পাশাপাশি ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সম্ভাবনা সম্পর্কেও তাঁদের সচেতনতা বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল লেনদেনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যেই ইউআইইউর সঙ্গে অংশীদারত্ব করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
ওয়ান ব্যাংক ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘বাংলা কিউআর’ সেবা চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সহজে ডিজিটাল লেনদেন করতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে ইউআইইউর ৪০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। ক্যাম্পাসের নির্দিষ্ট কিছু লেনদেনে এখন থেকে শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করতে পারবেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্টল নিয়ে অংশ নেয়। সেখানে শিক্ষার্থী ও অতিথিরা সরাসরি এই ব্যবস্থায় লেনদেনের অভিজ্ঞতা নেন।
অনুষ্ঠানে ‘বাংলা কিউআর’ উদ্যোগ এবং দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার উন্নয়নে এর ভূমিকা নিয়ে একটি উপস্থাপনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ইউআইইউর বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রে নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থার সূচনা করা হয়।
ইউআইইউর উপাচার্য মো. আবুল কাশেম মিঞা বলেন, দেশে নতুন কোনো উদ্যোগ এলে মানুষ তা সহজে গ্রহণ করতে চায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা থাকলেও গভর্নর ‘বাংলা কিউআর’সহ ডিজিটাল লেনদেনের উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছেন। এ জন্য তিনি গভর্নরকে সাধুবাদ জানান।
অনুষ্ঠানে উপাচার্য ইউআইইউ ক্যাম্পাসকে নগদবিহীন ক্যাম্পাসে রূপান্তরের ঘোষণা দেন। এ সময় ২০০৭ সালে চীন সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সেখানকার পেমেন্ট ব্যবস্থা নিয়েও কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান, পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের পরিচালক মঈনুল কবির, ওয়ান ব্যাংক ও ইউআইইউর শিক্ষক এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি