
আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের সোমালিল্যান্ডকে ঘিরে ইসরায়েল ও তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেতে পারে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে তুরস্ক ও সোমালিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা চাচ্ছে সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তারা। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে অঞ্চলটির সরকার।
২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এটিই কোনো জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে সোমালিল্যান্ডের প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে সোমালিয়া এবং আফ্রিকান ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশ। তুরস্কও ইসরায়েলের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে।
সোমালিল্যান্ডের পররাষ্ট্রবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মোহাম্মদ ওসমান ফাদালের বক্তব্য অনুযায়ী, তুরস্ক সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুতে সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এ কারণে সোমালিল্যান্ড ইসরায়েলের কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য নিরাপত্তা সহায়তা চায়।
ফাদাল বলেন, ‘আমরা তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সহায়তা চাই।’
সোমালিল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদিরাহমান হাসানও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ককে আঞ্চলিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ১৯৯১ সাল থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আরব ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। ফলে এখন নতুন অংশীদারের দিকে এগোচ্ছে সোমালিল্যান্ড।
হাসানের ভাষ্য, সোমালিল্যান্ডের নিজস্ব সেনাবাহিনী থাকলেও প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। ইসরায়েলের কাছ থেকে এ ক্ষেত্রে সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশা করছে তারা। ইতোমধ্যে ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডের পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ ইউসুফ আলী জানিয়েছেন। তবে সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের কোনো আলোচনা বা পরিকল্পনা নেই বলেও তিনি জানিয়েছেন।
হুতিদের নিয়ে ভিন্ন অবস্থান
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও ইয়েমেনের হুতিদের বিষয়ে সোমালিল্যান্ডের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, হুতিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চান না তারা। বরং ইয়েমেনের সংঘাতের সমাধানে আলোচনার পথ অনুসরণের পক্ষে তারা।
সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের অন্যতম অভিন্ন স্বার্থ হলো তুরস্কের প্রভাব মোকাবিলা করা। তবে একই সময়ে এডেন উপসাগর ও বাব আল-মান্দাব ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সোমালিল্যান্ড এডেন উপসাগরের তীরে অবস্থিত। অঞ্চলটির বেরবেরা বন্দর ভারত মহাসাগর ও লোহিত সাগরের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছে অবস্থিত। ইয়েমেনের হুতিদের হামলার কারণে এই নৌপথের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
সম্প্রতি ইয়েমেনের হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন বাব আল-মান্দাব ঘিরে সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতির খবরও সামনে এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য অভিযানে ইয়েমেনি বাহিনীকে ব্যবহার করা হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ গোয়েন্দা বা প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সোমালিল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর ফলে অঞ্চলটি বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
তুরস্কের সঙ্গে সোমালিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
গত দেড় দশকে সোমালিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক গভীর হয়েছে। ২০১১ সালের দুর্ভিক্ষের সময় তৎকালীন তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সোমালিয়া সফরের পর দেশটিতে তুরস্কের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়তে থাকে।
তুরস্ক সোমালিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও বন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রমেও তুরস্কের উপস্থিতি রয়েছে। তুরস্কের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধিকে সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তারা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতেরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। বেরবেরা বন্দরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের বড় ধরনের কার্যক্রম রয়েছে। ফলে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর ঘিরে তুরস্ক, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এরই মধ্যে ইসরায়েলের সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার সমালোচনা করেছেন। তার ভাষ্য, এই স্বীকৃতি সোমালিল্যান্ড বা হর্ন অব আফ্রিকার কোনো পক্ষের জন্যই উপকারী নয় এবং অঞ্চলটিকে বিদেশি শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বানানো উচিত নয়।
নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি ঝুঁকিও
ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সোমালিল্যান্ডের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে বলে দেশটির কর্মকর্তারা মনে করছেন। তবে এর বিপরীত ঝুঁকিও রয়েছে। ইসরায়েলকে সামরিক ও নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করলে সোমালিল্যান্ড নিজেই আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
সোমালিল্যান্ড ইতোমধ্যে সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, ইয়েমেন ও এডেন উপসাগরকে ঘিরে বিভিন্ন বিরোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝখানে অবস্থান করছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও হর্ন অব আফ্রিকায় বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক জোট, বন্দর ও সামরিক স্বার্থ এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা জটিল হওয়ার কথা উঠে এসেছে।
ফলে সোমালিল্যান্ডের জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক একদিকে নতুন কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করলেও অন্যদিকে তাকে বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে। আগামী দিনে এই সম্পর্ক কোন দিকে যায়, তার ওপর হর্ন অব আফ্রিকা ও এডেন উপসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি অংশ নির্ভর করতে পারে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি