
রাজশাহী, ৩ অক্টোবর ২০২৬: খরার জন্য পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলে তপ্ত রোদের মধ্যেই নীরবে বদলে যাচ্ছে কৃষির চিত্র। ডিজেলচালিত পাম্পের গর্জন কিংবা জ্বালানি খরচ ছাড়াই সৌরশক্তির মাধ্যমে ভূগর্ভ থেকে পানি তুলে শুষ্ক জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। এতে এক সময়ের অনাবাদী ও মরুপ্রায় জমি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে উৎপাদনশীল কৃষিজমিতে।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকেরা ধান, বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মরিচসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করছেন। কোনো কোনো কৃষক বছরে তিনবার পর্যন্ত ধান উৎপাদন করছেন।
স্থানীয় কৃষক আনারুল জানান, আগে সেচের পানির জন্য দূরের পুকুর থেকে ডিজেলচালিত পাম্পের মাধ্যমে দীর্ঘ পাইপলাইন টেনে পানি আনতে হতো। এতে সেচের খরচ এত বেশি ছিল যে ফসল উৎপাদনের পর লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ত। পাশাপাশি এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের সংযোগও ছিল না।
সৌর সেচ ব্যবস্থা চালুর পর পরিস্থিতি বদলে গেছে বলে জানান তিনি। এখন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পাম্প চালু হয় এবং কোনো জ্বালানি খরচ ছাড়াই পানি উঠতে থাকে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি সৌর পাম্পের মাধ্যমে প্রায় ২০ জন কৃষকের ৩০ থেকে ৩৫ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটির মাধ্যমে যৌথভাবে এই ব্যবস্থা পরিচালনা করা হচ্ছে।
আরেক কৃষক সুমন জানান, আগে তারা মূলত আমন ধান এবং শীতকালীন সবজি বা ডালের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এখন সহজে সেচের পানি পাওয়ায় আউশ ও বোরো ধানের পাশাপাশি আগাম জাতের সবজি চাষ করতে পারছেন। এতে তাদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কৃষক আখতার হোসেন বলেন, সেচের পানির সহজলভ্যতা এক সময়ের অনাবাদী ও মরুপ্রায় জমিকে উর্বর কৃষিজমিতে রূপান্তর করেছে। তিনি জানান, পলিথিন মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করে আগাম জাতের ফুলকপির চারাও তৈরি করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপের কার্যকারিতা কমে আসছিল। এ পরিস্থিতিতে সেচ সংকট মোকাবিলায় কৃষকদের বিনামূল্যে সৌর সেচ ব্যবস্থা দেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত দুই বছরে রাজশাহী বিভাগে ৩২টি সৌর সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্ধারিত এলাকায় সেচের জন্য ২ অশ্বক্ষমতার ২৪টি স্থায়ী সৌর সেচ ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি আটটি বহনযোগ্য সিস্টেম দেওয়া হয়েছে, যাতে কৃষকেরা এক জমি থেকে অন্য জমিতে নিয়ে ব্যবহার করতে পারেন। বাগানে নির্দিষ্টভাবে সেচ দেওয়ার জন্য ১০টি প্রিসিশন সৌর ব্যবস্থাও স্থাপন করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক এস এম হাসানুজ্জামান জানান, টেন্ডার অনুযায়ী প্রতিটি সৌর পাম্প স্থাপনে প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তিনি বলেন, ৫৫০ ওয়াটের ছয়টি সোলার প্যানেল থেকে মোট ৩ হাজার ২০০ ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। ২ অশ্বক্ষমতার পাম্পটি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিঘা জমিতে পানি সরবরাহ করতে পারে।
তার ভাষ্য, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার কারণে যেসব এলাকায় গভীর নলকূপের সেচ এলাকা বা কমান্ড এরিয়া কমে গেছে, সেখানে এই প্রযুক্তি বিশেষভাবে কার্যকর। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, কোনো গভীর নলকূপের সেচ এলাকা আগে প্রায় ১৫০ বিঘা থাকলেও পরে তা কমে ৮০ বিঘায় নেমে এসেছে। এ ধরনের এলাকায় সৌর সেচ ব্যবস্থা কার্যকর সমাধান হতে পারে।
প্রকল্প পরিচালক জানান, সৌর সেচ ব্যবস্থার ফলে কৃষকদের সেচ ব্যয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং ফসলের নিবিড়তা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ভবিষ্যতে বিদ্যমান ডিজেল ও বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পেও সৌর প্যানেল যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মোহনপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আবদুল মতিন বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগ নেই এমন দুর্গম এলাকায় সৌর সেচ বিশেষভাবে কার্যকর। তবে সেচ মৌসুমের বাইরে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে এই উদ্যোগ আরও কার্যকর ও অর্থবহ হতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম এই উন্নয়নকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান নির্ভরশীল উপাদান হলো সেচ। বরেন্দ্রের অনাবাদী জমিতে সৌরশক্তির ব্যবহারে সেচ সুবিধা বাড়ার ফলে কৃষি উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি