
নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে রাসায়নিক বালাইনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট (আইপিএম) প্রযুক্তির ব্যাপক সম্প্রসারণ জরুরি বলে মনে করছেন কৃষি গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে গত কয়েক দশকে কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে। তবে মাত্রাতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত বালাইনাশক ব্যবহারের কারণে ফসলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ বা রেসিডিউ থেকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের পাশাপাশি উপকারী পোকামাকড়, মাছ, জলজ প্রাণী ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যও ক্ষতির মুখে পড়ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষতিকর পোকা ও রোগবালাই দমনে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার করলে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফলের পরিবর্তে উল্টো ক্ষতি হতে পারে। অননুমোদিত বালাইনাশক কিংবা ভুল মাত্রায় ও ভুল সময়ে প্রয়োগের কারণে পোকামাকড়ের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
এ ছাড়া অনেক কৃষকের বালাইনাশকের সঠিক মাত্রা, প্রয়োগের সময় এবং নিরাপদ ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান এবং বর্তমানে সিটি ইউনিভার্সিটির কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. খন্দকার শরিফুল ইসলাম বলেন, পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক, ছত্রাকনাশকসহ নানা ধরনের বালাইনাশক নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব রাসায়নিক ব্যবহারের পর ফসল ও খাদ্যদ্রব্যে অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে।
তিনি বলেন, বালাইনাশকের এসব অবশিষ্টাংশ মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করার পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনিয়ন্ত্রিত বালাইনাশক ব্যবহারে ক্ষতিকর পোকামাকড়ের পাশাপাশি ফসলের জন্য উপকারী মিত্রপোকাও ধ্বংস হচ্ছে। এতে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য ব্যাহত হতে পারে।
অধ্যাপক শরিফুল ইসলামের মতে, বালাইনাশক শুধু ক্ষতিকর পোকামাকড় ধ্বংস করে না, পরিবেশের অন্যান্য প্রাণীর ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফসলে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রয়োজনের তুলনায় কম রাসায়নিক ব্যবহার করেই কার্যকরভাবে ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মন্ডল বলেন, নিরাপদ ফসল উৎপাদন ও পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। আইপিএমের মাধ্যমে পরিবেশের ওপর চাপ কমিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী এক বা একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করে ক্ষতিকর পোকা ও রোগবালাইকে অর্থনৈতিক ক্ষতির সীমার নিচে রাখা হয়।
তিনি জানান, এই ব্যবস্থাপনায় উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ, বালাই সহনশীল জাত ব্যবহার, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ এবং সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে বালাইনাশকের সময়োচিত ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।
বাংলাদেশ শাকসবজি, ফল ও পান ফসলের পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় জৈব বালাইনাশকভিত্তিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাসায়নিক বালাইনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আইপিএম পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
তার মতে, আইপিএমের মূল লক্ষ্য হলো কম পরিমাণে বালাইনাশক ব্যবহার করে ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা। একই সঙ্গে বায়োপেস্টিসাইড বা জৈব বালাইনাশক এবং বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল বা জৈবিক নিয়ন্ত্রণের মতো পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (বালাইনাশক মান নিয়ন্ত্রণ) ও ‘নিরাপদ ফসল উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি’ বিষয়ক ফোকাল পার্সন কৃষিবিদ মো. মাজেদুর রহমান বলেন, নিরাপদ ফসল উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষায় আইপিএমভিত্তিক প্রকল্পের গুরুত্ব রয়েছে।
তিনি জানান, গত প্রায় তিন বছরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে এ ধরনের প্রকল্পের ঘাটতি রয়েছে। এতে মাঠ পর্যায়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের কার্যক্রম এবং কৃষক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে আইপিএম প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং নিরাপদ ফসল উৎপাদনে সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়নে দ্রুত প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাসায়নিক বালাইনাশকের বিকল্প হিসেবে দেশে ইতোমধ্যে বিভিন্ন যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে সেক্স ফেরোমোন ফাঁদ, হলুদ আঠালো ফাঁদ ও আলোর ফাঁদ উল্লেখযোগ্য। এসব পদ্ধতি ব্যবহার করে রাসায়নিক প্রয়োগ ছাড়াই বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ধানের ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে ‘পার্চিং’ বা পাখির বসার ব্যবস্থা করাও একটি পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে ধানখেতে বাঁশের আগা, কঞ্চি বা গাছের ডাল পুঁতে দেওয়া হয়। সেখানে পাখি বসে ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খায়। বিশেষ করে মাজরা পোকা নিয়ন্ত্রণে এ পদ্ধতি কার্যকর বলে কৃষিবিদরা মনে করেন।
আইপিএমের মাধ্যমে রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি মাটি, পানি ও জলজ পরিবেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ব্যাঙ, মাকড়সা ও অন্যান্য মিত্রপোকাসহ প্রকৃতির উপকারী জীবের স্বাভাবিক পরিবেশও সংরক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।
তাদের মতে, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য শুধু কৃষকদের বালাইনাশকের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিলেই হবে না। এর পাশাপাশি কার্যকর ও সহজলভ্য বিকল্প প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এজন্য মাঠ পর্যায়ে কৃষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত পরামর্শ কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, মাটির গুণাগুণ বজায় রাখা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সমন্বিত লক্ষ্য অর্জনে আইপিএম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রাসায়নিক বালাইনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এই প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে ব্যাপকভাবে পৌঁছে দিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি গবেষক, কৃষিবিদ, কৃষি সম্প্রসারণকর্মী ও কৃষকদের সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি