
পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের খেলা, গহিন অরণ্য, ঝরনার স্বচ্ছ জল আর মাতামুহুরী নদীর ছুটে চলা। প্রকৃতি যেন দুহাত ভরে সাজিয়েছে বান্দরবানের আলীকদমকে। অথচ এত সৌন্দর্যের মধ্যেও সন্ধ্যা নামলেই থেমে যায় পর্যটন।
দিনের আলো ফুরাতেই পর্যটকদের সামনে নেমে আসে অন্ধকার আর বিনোদনহীনতা। ফলে কোটি টাকার সম্ভাবনা থাকা পর্যটন খাতের বড় অংশই থেকে যাচ্ছে অব্যবহৃত।
আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস।
পর্যটন বিকাশের নানা পরিকল্পনা ও উদ্যোগের কথা বলা হলেও আলীকদমে পর্যটকদের দীর্ঘ সময় ধরে রাখার মতো পরিকল্পিত অবকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি। মিরিঞ্জা, মারাইংতং, লাংলুক, ক্রিসেতং, রানরং, থাইনখোয়াইন, মিনিয়েংপাড়া, সাইংপ্রুসহ পাহাড়ের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা দর্শনীয় স্থানগুলোতে প্রতিদিনই বাড়ছে পর্যটকের আনাগোনা।
কিন্তু বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার পর এসব পর্যটকের বড় অংশের সামনে কার্যত আর কোনো বিনোদনের সুযোগ থাকে না।
বিশেষ করে একদিনের সফরে আসা পর্যটকদের ভোগান্তি বেশি। সকাল থেকে বিভিন্ন পর্যটন স্পট ঘুরে বিকেলে উপজেলা সদরে ফিরলেও সন্ধ্যার পর পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘোরার মতো পরিকল্পিত কোনো স্থান নেই। শিশুদের জন্য নেই বিনোদনকেন্দ্র, নেই মানসম্মত ওয়াকওয়ে কিংবা উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক আয়োজন।
ফলে হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁতেই সময় কাটিয়ে রাত পার করতে হয় পর্যটকদের।
অথচ আলীকদমের পর্যটনকে শুধু পাহাড় দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থানীয় সংস্কৃতি, খাবার, হস্তশিল্প ও পাহাড়ি জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সন্ধ্যায় স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, পাহাড়ি খাবারের আয়োজন, হস্তশিল্পের বাজার, উন্মুক্ত মঞ্চ ও হাঁটার পথ তৈরি করা গেলে পর্যটকদের অবস্থানের সময় যেমন বাড়বে, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতেও যুক্ত হবে নতুন আয়।

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আলীকদমের পর্যটন নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু উদ্যোগ থাকলেও সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা নেই। একটি স্পট তৈরি বা প্রচারের পর সেটিকে ঘিরে পর্যটকদের নিরাপত্তা, যাতায়াত, বিশ্রাম, পরিচ্ছন্নতা, খাবার ও রাতযাপনের সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।
মিরিঞ্জা ও মারাইংতংয়ের মতো জনপ্রিয় স্থানগুলোতে পর্যটকের চাপ বাড়লেও পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা না থাকায় অনেক সময় ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাদের।
দুর্গম স্পটগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। ফলে পর্যটনের প্রচার যতটা হচ্ছে, সেই তুলনায় পর্যটকসেবা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি এখনও পিছিয়ে রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যটক একদিন এসে কয়েক ঘণ্টা ঘুরে চলে গেলে তার অর্থনৈতিক সুফল সীমিত থাকে। কিন্তু একজন পর্যটক যদি দুই-তিন দিন অবস্থান করেন, তাহলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, স্থানীয় গাইড, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হস্তশিল্প বিক্রেতাসহ বহু মানুষ এর সুফল পান। তাই পর্যটকদের আলীকদমে দীর্ঘ সময় ধরে রাখার ব্যবস্থা করা এখন সবচেয়ে জরুরি।
তাদের মতে, উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, পার্বত্য জেলা পরিষদ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। কোন স্পটে কী ধরনের অবকাঠামো হবে, কোথায় রাতযাপনের ব্যবস্থা থাকবে, কোথায় সাংস্কৃতিক আয়োজন হবে এবং কীভাবে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, তা নির্ধারণ করে এগোতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আলীকদমের সবচেয়ে বড় সম্পদ প্রকৃতি। সেই প্রকৃতিকে নষ্ট না করে পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে পাহাড়ি এই জনপদে পর্যটন অর্থনীতির নতুন দুয়ার খুলতে পারে। তবে শুধু বিশ্ব পর্যটন দিবসে পর্যটনের কথা বললেই হবে না, প্রয়োজন বছরজুড়ে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে আলীকদম। কিন্তু সূর্য ডোবার পর সেই ডাক যেন থেমে যায়। দিনের পর্যটনকে রাতের অর্থনীতিতে রূপ দিতে না পারলে পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই বিপুল সম্ভাবনা কতটা কাজে আসবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ