
মুন্সীগঞ্জে আগাম শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদনে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। বীজতলায় চারা উৎপাদন, পরিচর্যা ও বিক্রিতে এখন ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং ফলন ভালো হওয়ায় উৎপাদিত চারার চাহিদা ও দামও ভালো পাচ্ছেন কৃষকরা। লাভজনক হওয়ায় এ খাতে নতুন উদ্যোক্তার সংখ্যাও বাড়ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মুন্সীগঞ্জে ১ হাজার ১৯১ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন বিভিন্ন সবজির চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, শিম ও বেগুনের চারা।
জেলার সদর উপজেলায় ৩০০ হেক্টর, টঙ্গিবাড়ীতে ৩৭ হেক্টর, শ্রীনগরে ১০৮ হেক্টর, সিরাজদিখানে ২৮২ হেক্টর, লৌহজংয়ে ২৬০ হেক্টর এবং গজারিয়ায় ২০৪ হেক্টর জমিতে এসব আগাম সবজির চারা উৎপাদন করা হচ্ছে।
পঞ্চসার ইউনিয়নের ভট্টাচার্যভাগ এলাকার কৃষক আহম্মদ শরীফ লিটন জানান, এ বছর তিনি প্রায় এক একর জমিতে সবজির চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলা তৈরি করেছেন। চারা উৎপাদনে সাধারণত ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগে। ফলে একটি জমিতে এক মৌসুমে দুইবার পর্যন্ত চারা উৎপাদন করা সম্ভব হয়।
তিনি বলেন, মুন্সীগঞ্জের উৎপাদিত চারার চাহিদা দেশের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে। ঢাকার আশপাশের সাভার ও কেরানীগঞ্জ ছাড়াও শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও নারায়ণগঞ্জের কৃষকরাও এখান থেকে চারা কিনে নিয়ে যান।
কৃষকদের মতে, মুন্সীগঞ্জের মাটি উর্বর হওয়ায় এবং চারা উৎপাদনে বাড়তি যত্ন নেওয়ার কারণে এখানকার চারার গুণগত মান ভালো। দেশীয় বীজের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করায় বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের কাছেও এসব চারার চাহিদা রয়েছে।
বজ্রযোগিনী ইউনিয়নের বীজতলা উৎপাদনকারী কৃষক মো. নওয়াব শিকদার জানান, এবার তিনি প্রায় ৭০ শতাংশ জমিতে বীজতলা তৈরি করেছেন। প্রতি মৌসুমে প্রায় দুই মাসের মধ্যে তিনি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার চারা উৎপাদন ও বিক্রি করেন।
বংশপরম্পরায় বীজতলা তৈরির সঙ্গে যুক্ত এই কৃষক বলেন, একসময় মুন্সীগঞ্জের চারার চাহিদা আরও বেশি ছিল এবং তখন মূলত দেশীয় জাতের চারা উৎপাদন করা হতো। বর্তমানে দেশীয় জাতের পাশাপাশি কিছু বিদেশি জাতের বীজও ব্যবহার করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. হাবিবুর রহমান জানান, মুন্সীগঞ্জে প্রতি বিঘা জমি থেকে চারা বিক্রি করে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। জেলার জমি তুলনামূলক উঁচু ও উর্বর হওয়ায় আগাম বীজতলা তৈরির উপযোগী পরিবেশ রয়েছে।
তিনি বলেন, বীজতলা তৈরির কাজে স্থানীয় শ্রমিকদের অনেকেই প্রশিক্ষিত। কৃষকরাও অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বীজতলা তৈরি ও চারার পরিচর্যা করেন। অধিকাংশ কৃষক জমিতে জৈব সার ব্যবহার করেন। এতে চারার গুণগত মান ভালো থাকে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বীজতলা তৈরি ও চারা বিক্রি লাভজনক হওয়ায় মুন্সীগঞ্জে ইতোমধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে বীজতলা ও চারা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য পলিমেট হাউজ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে কৃষি বিভাগের। এ ধরনের অবকাঠামো তৈরি হলে প্রতিকূল আবহাওয়ার সময়ও চারা উৎপাদন ও সংরক্ষণে কৃষকদের সক্ষমতা বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
আগাম শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদনকে কেন্দ্র করে মুন্সীগঞ্জে কৃষকদের পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তারাও যুক্ত হচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব চারার চাহিদা থাকায় এ খাত স্থানীয় কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি