
১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে সারাদেশে মেধাতালিকায় ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মহিউদ্দিন রুমান। প্রথমবার বিজেএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েই তিনি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
শিক্ষার অনুকূল পরিবেশহীন প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে নানা সামাজিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে মহিউদ্দিনের এই সাফল্য এসেছে। নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ফল প্রকাশের মুহূর্তটি তার জীবনের ‘লাইফ চেঞ্জিং মোমেন্ট’।
তিনি বলেন, ‘রেজাল্ট প্রকাশের মুহূর্তের সফলতা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এটা আমার জন্য এককথায় লাইফ চেঞ্জিং মোমেন্ট। সেদিন ওয়েবসাইটের ট্রাফিকের কারণে সাইট ব্লক ছিল। তাই শুরুতে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে এটাই আসল রেজাল্ট কিনা! পরে নিজে ওয়েবসাইটে অ্যাক্সেস পেয়ে যখন নিশ্চিত হলাম, তখন ঘরে আমার মা আর ছোট বোন ছিল। আনন্দে-উচ্ছ্বাসে তাদের জড়িয়ে ধরে খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম।’
নিজের এই সাফল্যের পেছনে পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষক, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অবদানের কথা উল্লেখ করেন মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘এই সাফল্যের পেছনে অনেকের অবদানই রয়েছে। আমার বাবা-মায়ের ত্যাগ আর বড় ভাইয়ের অবদান তো অনস্বীকার্য। এর বাইরে আমার অনেক সম্মানিত শিক্ষক, প্রিয় বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও এই দীর্ঘ যাত্রায় নানাভাবে অবদান রেখেছেন এবং পাশে ছিলেন।’
মহিউদ্দিনের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার চরমোহনা গ্রামের পাঁচ কড়ি মাতাব্বর বাড়িতে। তার বাবা মো. শদুমিয়া এবং মা তাছলিমা বেগম। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি একজন। বড় ভাই সৌদি আরবে প্রবাসী এবং ছোট বোন ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন।
শিক্ষাজীবনে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গৃদকালিন্দিয়া হাজেরা হাসমত ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০২০ সালে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন মহিউদ্দিন। এরপর ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটে ৮৭তম স্থান অর্জন করে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ২০২৫ সালে ঢাবি থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেছেন তিনি। বর্তমানে এলএলএমে পড়াশোনা করছেন।
পড়াশোনার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে নিজের বেড়ে ওঠার পরিবেশকে উল্লেখ করেন মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমার সফলতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল আমার বেড়ে ওঠার পরিবেশটা। আমাদের গ্রামে শিক্ষার পরিবেশ নেই বললেই চলে। নেশা, জুয়া ও নানা বখাটেপনায় জড়িয়ে ছেলেমেয়েরা অকালে ঝরে পড়ে। সেই পরিবেশ থেকে নিজেকে সামলে নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে উঠে আসাটা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল।’
তবে বাবার কঠোর শাসন তাকে ওই পরিবেশ থেকে বেরিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে সহায়তা করেছে বলে জানান তিনি। মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমার বাবার কঠোর শাসনের কারণেই এই সামাজিক বাধা উৎরানো সম্ভব হয়েছে। বাবার সেই কড়া শাসনই আজ আমাকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।’
প্রথমবারের মতো বিজেএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েই এমন ফল পাওয়াকে মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া হিসেবে দেখছেন মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, এটাই ছিল আমার জীবনে প্রথম বিজেএস পরীক্ষা। এখনও আমাদের মাস্টার্স শেষ হয়নি, রানিং অবস্থায় পরীক্ষা দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, প্রথমবার অংশ নিয়েই সারাদেশে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করতে পেরে মহান আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি।’
প্রতিকূল পরিবেশ পেরিয়ে প্রথমবারের পরীক্ষায় সারাদেশে ষষ্ঠ স্থান অর্জনের মাধ্যমে মহিউদ্দিন রুমানের এই সাফল্য তার শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ পরিশ্রম ও পরিবারের সহযোগিতার প্রতিফলন হিসেবে উঠে এসেছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি