
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, গুলি ও নির্যাতনের নানা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন ৫৫ বছর বয়সী এক প্রত্যক্ষদর্শী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেছেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া তাঁর এক বন্ধু গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। তাঁর শরীরে সাত শতাধিক ছররা গুলির চিহ্ন ছিল। পরে থাইল্যান্ডে পাঁচ মাস চিকিৎসা নিলেও বর্তমানে তিনি পঙ্গু হয়ে আছেন।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে ওই সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। নিরাপত্তার কারণে সাক্ষীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে দুই নম্বর সাক্ষী হিসেবে তিনি সাক্ষ্য দেন।
সাক্ষীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সন্ধ্যায় তিনি জানতে পারেন, তাঁর বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজা নীলক্ষেত এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। একই দিনে নিউমার্কেট, আজিমপুর, বাড্ডা ও রামপুরাসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের হতাহত হওয়ার ঘটনাও তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, ১৯ জুলাই ১৪ দলের বৈঠকের পর আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন। এরপর ২০ জুলাই থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বাসাবাড়িতে তল্লাশি চালান বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সাক্ষীর দাবি, আন্দোলনকারীদের সহায়তা করার কারণে তাঁকেও খুঁজতে থাকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ২৪ জুলাই তিনি পালিয়ে চট্টগ্রামে চলে যান। পরে ২৬ জুলাই ঢাকায় ফিরে আহত আন্দোলনকারীদের খাবার, চিকিৎসা ও পোশাকসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন বলে জানান।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২ আগস্ট রাতে আজিমপুরের বাড়ি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ঘেরাও করলে তিনি ছাদ থেকে অন্য ছাদে লাফিয়ে পালিয়ে যান। পরদিন ভোরে আবার চট্টগ্রামে চলে যান। তাঁর দাবি, ওই রাতেই সাতকানিয়ায় তাঁর গ্রামের বাড়িতেও হামলা চালানো হয়।
এরপর ৪ আগস্ট চট্টগ্রাম নিউমার্কেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার কথা জানান সাক্ষী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন বেলা ১১টার দিকে তাঁর পাশে থাকা চট্টগ্রাম ইসলামিক ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ছাত্র একেএম নুরুল্লাহ গুলিবিদ্ধ হন। তাঁর কোমর থেকে পা পর্যন্ত অসংখ্য গুলি লাগে এবং একটি গুলিতে তাঁর রানের মাংস ছিঁড়ে যায় বলে সাক্ষী দাবি করেন। চিকিৎসায় সহায়তা করার পর ওই তরুণ পঙ্গু হয়ে গেছেন বলেও জানান তিনি।
সাক্ষী আরও দাবি করেন, ৪ আগস্ট চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় বহু আন্দোলনকারী আহত ও নিহত হন। তাঁর তিন কর্মচারীর শরীরেও ছররা গুলি লাগে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।
৫ আগস্টের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সাক্ষী বলেন, তিনি আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের নিয়ে আজিমপুর-নিউমার্কেট এলাকা থেকে গণভবনের দিকে রওনা হন। পথে বিভিন্ন বাধার মুখে পড়লেও দুপুরের দিকে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন—এমন খবর শুনে তাঁরা গণভবনের দিকে যাত্রা করেন এবং সেখানে আনন্দ মিছিলে যোগ দেন বলে জানান।
সাক্ষীর জবানবন্দির সবচেয়ে আলোচিত অংশ আসে ওই দিন বিকেলে। তাঁর দাবি, বিকেল ৩টার দিকে বন্ধু খলিলুর রহমান ফোন করে জানান যে তাঁরা বাড্ডা এলাকায় আটকা পড়েছেন এবং পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের লোকজন তাঁদের ঘিরে রেখেছে। সাহায্যের অনুরোধ পেয়ে বিকেল ৫টার দিকে তিনি বাড্ডায় পৌঁছান।
সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে একটি গলিতে তিনি খলিলুর রহমানকে খুঁজে পান। তখন তাঁর বন্ধুর শরীরে সাত শতাধিক ছররা গুলির চিহ্ন দেখতে পান বলে দাবি করেন। পরে তাঁকে একটি বাড়িতে নিয়ে রাখা হয় এবং হাসপাতালে পাঠানো হয়। সরকারের সহায়তায় খলিলুর রহমান থাইল্যান্ডে পাঁচ মাস চিকিৎসা নেন। বর্তমানে দেশে ফিরলেও তিনি পঙ্গু হয়ে আছেন বলে সাক্ষী জানান।
জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে সাক্ষী আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা ও আহত করার ঘটনায় শেখ হাসিনার তৎকালীন পরামর্শদাতাদের ভূমিকার অভিযোগ তোলেন। তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
জবানবন্দি শেষে সাক্ষীকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। মামলায় কামরুল ইসলাম ও রাশেদ খান মেননকে আসামি করা হয়েছে এবং সাক্ষ্যগ্রহণের সময় তাঁরা ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন প্রসিকিউটর মঈনুল করিম। তাঁর সঙ্গে প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ, মামুনুর রশিদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
তবে ট্রাইব্যুনালে দেওয়া এসব বক্তব্য বর্তমানে সাক্ষীর জবানবন্দি ও অভিযোগের অংশ। এসব অভিযোগের সত্যতা এবং আসামিদের দায় আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি