
দুপুরের রোদে পুড়ছে নদীপাড়। এক হাতে বড়শি, আরেক হাতে লাঠি—মোহাম্মদ হাজিক তাকিয়ে আছেন জলের গভীরে। তাঁর পাশে কয়েকজন তরুণ, মুখে তীব্র মনোযোগ, চোখ নদীতে পলকহীন। জাল ছুঁড়ে দেন একজন। মিনিট পাঁচেক পরেই জল ফেটে উঠে আসে ছটফটানো এক ঝাঁক সাকারমাউথ কাঁকড়া মাছ—যাকে স্থানীয়রা বলে ‘ইকো কিলার’।
হাজিক বলেন, “একটা জাত খেয়ে নিচ্ছে পুরো নদী, আমরা অন্য জাত হয়েও চেষ্টা করছি নদীটাকে বাঁচাতে।”
এই যুদ্ধটা মাছ ধরার না, এটা নদী বাঁচানোর।
বিদেশি এক দানবের আগমন
সাকারমাউথ কাঁকড়া মাছ—বৈজ্ঞানিক নাম Pterygoplichthys। দক্ষিণ আমেরিকার মাছ, আনা হয়েছিল অ্যাকুরিয়ামের সৌন্দর্য বাড়াতে। কিন্তু যখন বাড়ির ট্যাংক ছোট হয়ে পড়ে, অনেকে ফেলে দেয় পাশের নদীতে। তারপর? তারা জন্ম নেয়, বাড়ে, শ্বাস নেয় বাতাস থেকে, কাদা খুঁড়ে ডিম পাড়ে—আর একসময় পুরো নদী দখল করে নেয়।
এই মাছরা খায় না অন্য মাছকে, কিন্তু ধ্বংস করে তাদের আবাস। কাদা খুঁড়ে খুঁড়ে ডিম পাড়ার সময় তারা নদীর তলদেশ বদলে দেয়, নদীঘেঁষা বাস্তুতন্ত্রকে এলোমেলো করে ফেলে। স্থানীয় মাছ যেমন পুঁটি, শিং, টেংরা, কেলস, বারামুন্দি—ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে।
এক সময় এই নদীগুলো ছিল স্থানীয়দের জীবিকার উৎস। এখন সেগুলো যেন পরবাসে বন্দি।
মানুষের প্রতিরোধ: এক দল তরুণের উত্থান
২০২০ সালের দিকে মোহাম্মদ হাজিক প্রথম খেয়াল করেন, তাঁর প্রিয় মাছগুলো নদী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বংশ পরম্পরায় মাছ শিকার করতেন তাঁর দাদা। নদীর প্রতি একটা টান বরাবর ছিল। তিনি নিজে স্বাস্থ্য পরামর্শক হলেও অবসরে মাছ ধরতেন। কিন্তু বারবার বড়শিতে উঠতে লাগল ওই এক মাছ—এই বিদেশি আগন্তুক।
তখনই সিদ্ধান্ত নিলেন, এদেরই শিকার করবেন। নিজে নিজেই শুরু করলেন। পরে টিকটকে ভিডিও দিলেন। অচিরেই তাঁর ভিডিও ভাইরাল হলো।
“আমি তো শখ করে শুরু করেছিলাম,” হাজিক বলেন। “কিন্তু এখন এটা একটা মিশন।”
দু-তিনজন বন্ধু এসে জুটল। তারা আবার নিজেরা নতুন বন্ধুদের ডাকল। দিনে দিনে দলটা বড় হলো। এখন ‘Alien Fish Catcher’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপ পরিচালনা করেন তিনি। কেউ আসে সাইকেলে, কেউ বাসে, কেউ বাচ্চা নিয়ে—কিন্তু সবার লক্ষ্য একটাই: যত বেশি সম্ভব কাঁকড়া মাছ তুলে ফেলা।
যুদ্ধটা সহজ না
একবার একদিনে তাঁরা ধরেছিলেন ৩০০টির মতো কাঁকড়া মাছ। কিন্তু সমস্যা হলো, এই মাছ একাধারে ৩০ বছর বাঁচে, বছরে তিনবার ডিম পাড়ে এবং প্রতিবারে ডিম দেয় ৩৫০টি পর্যন্ত।
নদী যদি একটা দেশ হয়, এই প্রজাতির হাতেই যেন সে পরাধীন।
আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, এই মাছ বাতাস থেকেও শ্বাস নিতে পারে। অর্থাৎ, পানি না থাকলেও এরা বেঁচে থাকতে পারে। ফলে সামান্য ডোবা-জলাশয়েও এদের দেখা মেলে।
সরকারের ভূমিকা
মালয়েশিয়ার ফিসারিজ বিভাগ বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কর্তৃপক্ষ বলছে, সম্পূর্ণ নির্মূল করা যাবে না এই মাছকে, তবে জনগণের সাহায্য ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। তাই তারা এই ‘শিকারি’ দলগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে—তাদের পুরস্কৃত করছে, প্রচারণা চালাচ্ছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, “তাদের কাজ শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, সচেতনতা তৈরি করাও।”
এক নদীর গল্প, বহু জীবনের আশা
হাজিকরা শুধু মাছ ধরেন না। তাঁরা ভিডিও করেন, মানুষকে শেখান। শিশুরা দেখে আগ্রহী হয়। স্থানীয় জেলেরা প্রশংসা করেন। কেউ কেউ বলেন, “আগে নদী মানেই ছিল জীবনের গন্ধ। এখন আবার সেই গন্ধ একটু একটু করে ফিরছে।”
প্রতিদিন তাঁরা ১০–১৫ কেজি মাছ ধরেন। এরপর সেগুলো স্থানীয় পশু আশ্রয়কেন্দ্রে দিয়ে দেন—পাখি, কুকুর বা অন্য প্রাণীদের খাবার হিসেবে।
আল জাজিরা থেকে কামাল হোসাইন অনুদিত
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ