মঙ্গলবার ● ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
● রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঘিরে মালয়েশিয়া-জাতিসংঘের ভিন্ন অবস্থান      ● ইরাকের শেষ ঘাঁটিও ছাড়ছে মার্কিন বাহিনী      ● আ'লীগের প্রচার সম্পাদক গ্রেপ্তার      ● ইলিশ ধরতে গিয়ে জেলে নিখোঁজ      ● ভিপি শাহীনসহ স্বেচ্ছাসেবক লীগের ৪ নেতা গ্রেপ্তার      ● চুরি হওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার      ● ২৫ গ্রামের মানুষের কান্নার কারণ যে রাস্তা      ● কাটা-ছেঁড়া ছাড়াই হৃদরোগের আধুনিক চিকিৎসা      ● লটে নিউইয়র্ক টাইমস কর্মকর্তাকে গুলি, শ্বশুর-শাশুড়ি গ্রেপ্তার      ● দুর্গাপূজার ছুটি ২২ অক্টোবরও হতে পারে      ● যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম      ● পল্লী মেলার নামে জুয়া ও অশ্লীল নৃত্য      
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঘিরে মালয়েশিয়া-জাতিসংঘের ভিন্ন অবস্থান
স্বদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৫৩ পিএম

মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই দেশটির নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করেছে মালয়েশিয়া। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) প্রথম ধাপে ১ হাজার ৪৭৬ জন মিয়ানমারের নাগরিককে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। মালয়েশিয়ার দাবি, এটি স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন কর্মসূচির অংশ।

তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন সতর্ক করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ নেই। ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই।

মালয়েশিয়ার পারাক রাজ্যের লুমুট নৌঘাঁটির কাছে মঙ্গলবার সকালে পুলিশি পাহারায় কয়েক ডজন বাস একটি স্টেডিয়ামে পৌঁছায়। সেখানে প্রত্যাবাসনপ্রত্যাশীদের প্রক্রিয়াজাত করার পর নৌঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া এবং জাহাজে করে মিয়ানমারে পাঠানোর কথা। সাংবাদিকদের স্টেডিয়াম এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের দুটি নৌবাহিনীর জাহাজ ও একটি হাসপাতাল জাহাজ ব্যবহারের কথা জানিয়েছে মালয়েশিয়া। পুরো কর্মসূচির আওতায় পর্যায়ক্রমে প্রায় ৫ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে মঙ্গলবারের দলে কতজন রোহিঙ্গা ছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় থাকা মিয়ানমারের প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা।

নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতিসংঘের আপত্তি

রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটি বলেছে, মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও সহিংসতার কারণে বর্তমানে শরণার্থীদের নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফেরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

ইউএনএইচসিআরের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো শরণার্থীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি অবশ্যই স্বেচ্ছায়, পর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এবং নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে হতে হবে।

মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য প্রত্যাবাসন কর্মসূচিটিকে স্বেচ্ছামূলক বলে জানিয়েছে। দেশটির সরকার বলছে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে।

মিয়ানমারে এখনও গৃহযুদ্ধ

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমারজুড়ে ব্যাপক সংঘাত চলছে। দেশটির সামরিক বাহিনী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে লড়াই করছে। রাখাইন রাজ্যেও মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। এই অঞ্চলেই দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ব্যাপক দমন-পীড়নের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ওই অভিযানের ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

মিয়ানমার সরকার এখনও রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না। দেশটির কর্তৃপক্ষ তাদের প্রায়ই ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তি

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে মালয়েশিয়ার সরকারের প্রতি আপত্তি জানিয়েছে ১৬০টির বেশি নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠন। তাদের আশঙ্কা, মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হলে রোহিঙ্গারা চলমান সহিংসতার পাশাপাশি জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ, আটক বা অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

ফর্টিফাই রাইটস নামে একটি মানবাধিকার সংগঠন এর আগে মালয়েশিয়াকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিয়ানমারের নাগরিককে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল। তাদের মতে, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিরা নির্যাতন, নিপীড়ন, সশস্ত্র সংঘাত ও জোরপূর্বক নিয়োগের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সও (এমএসএফ) প্রত্যাবাসন স্থগিত করে কাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে এবং তাদের প্রত্যেকের সম্ভাব্য ঝুঁকি কী, তা প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও একই ধরনের উদ্বেগ জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, যে পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছেড়ে পালিয়েছিলেন, সেই পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন না হলে শুধু মানুষকে দেশে ফিরিয়ে পাঠানো সংকটের সমাধান নয়।

মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের ওপর চাপ বাড়ছে

সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা ও অন্যান্য শরণার্থীদের ওপরও চাপ বেড়েছে। দেশটিতে শরণার্থীদের প্রতি স্থানীয় পর্যায়ে বিরূপ মনোভাব এবং অভিবাসনবিরোধী তৎপরতা জোরদার হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

চলতি বছরের জুলাইয়ে কুয়ালালামপুরে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার কার্যালয়ের বাইরে জড়ো হওয়া শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল। পরে তাদের কাছে ইউএনএইচসিআরের নথি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।

মালয়েশিয়া ১৯৫১ সালের জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনের সদস্য নয়। দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থী মর্যাদাও স্বীকৃতি দেয় না। ফলে দেশটিতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসন আইনের আওতায় অনিবন্ধিত অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পাঁচ হাজার মিয়ানমারের নাগরিক ফেরানোর পরিকল্পনা

মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রথম ধাপের ১ হাজার ৪৭৬ জনসহ মোট ৫ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে পর্যায়ক্রমে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপের ব্যক্তিদের মিয়ানমার সরকার শনাক্ত করেছে বলে জানিয়েছে মালয়েশিয়া।

মিয়ানমার সরকারও জানিয়েছে, যাচাই করা বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে দেশে ফেরাতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করছে। তবে রোহিঙ্গা অধিকারকর্মীদের বক্তব্য, কাগজে-কলমে ‘স্বেচ্ছামূলক’ প্রত্যাবাসন বলা হলেও আটক অবস্থায় থাকা কোনো ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে স্বাধীনভাবে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশেও ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা

মিয়ানমারের নিপীড়ন থেকে পালিয়ে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছেন। মালয়েশিয়াতেও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী থাকার তথ্য পাওয়া যায়।

ফলে মালয়েশিয়া থেকে মিয়ানমারে নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ শরণার্থী নীতির বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এখন মূল প্রশ্ন হলো—মিয়ানমারে চলমান যুদ্ধ, রাখাইনে সংঘাত এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান না করে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিরা দেশে গিয়ে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সতর্কতার বিপরীতে মালয়েশিয়া তাদের প্রত্যাবাসন কর্মসূচিকে স্বেচ্ছামূলক ও নিরাপদ বলে বর্ণনা করছে।



স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close