
কৃষিক্ষেত্রে সবজি খ্যাত ফলনের মধ্যে আলু উত্তরাঞ্চলের অন্যতম অর্থকরী ফসল। এ বছর বাম্পার ফলন হওয়া আলু সংরক্ষণ করা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বগুড়া ও জয়পুরহাটের কৃষক।
কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে প্রায় ১৪ লাখ টন আলু উৎপাদন হতে পারে। তবে এসব আলু সংরক্ষণে হিমাগার রয়েছে ৪২টি। এসব হিমাগারে প্রায় ৪ লাখ টন আলু সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। হিমাগারে স্থান সংকুলান না হওয়ায় কৃষকের বাড়িতেই আলু পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অবশিষ্ট আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। ফলে কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। যার কারণে আলু চাষ করে লোকসান গুণতে হচ্ছে এই অঞ্চলের কৃষকদেরকে।
কৃষি বিভাগ বলছে, এবছর অধিক সংখ্যক জমিতে আলু চাষ করেছেন বগুড়া ও জয়পুরহাটের কৃষক। পাশাপাশি ফলনও হয়েছে বাম্পার। এত বেশী পরিমাণ আলু সংরক্ষণ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে কৃষককে। তবে হিমাগারের বাহিরেও কৃষি বিভাগীয় প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে কৃষকের দুই হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করতে পেরেছে।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, স্থানীয় এবং উচ্চ ফলনশীল মিলে ৪৮টি জাতের আলুর আবাদ হয় বগুড়ায়। এর মধ্যে এবার সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে এস্টারিক্স (স্থানীয়ভাবে স্টিক নামে পরিচিত) নামে উচ্চফলনশীল জাতের আলু।
চলতি মৌসুমে জেলায় ৫৫ হাজার ৬০ হেক্টর জমিতে ১১ লাখ ৯৯ হাজার ৯১০ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে আবাদ হয়েছে ৬০ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে, যা গত বছরের তুলনায় ৫ হাজার ১৭৫ হেক্টর বেশি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আবাদি জমি ও ফলন দুটিই বেড়েছে। গত বছর হেক্টর প্রতি ২১ দশমিক ৬ টন আলু উৎপাদন হলেও এবার ২৩ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার অনন্তবালা গ্রামের কৃষক সেলিম উদ্দিন বলেন,দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করে এবার তার লোকসান হয়েছে কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা।
কৃষি বিভাগের মতে বগুড়া জেলার সাড়ে ৩৭ লক্ষ জনসংখ্যার জন্য বছরে আলুর চাহিদা রযেছে ৩ লাখ মেট্রিক টন। আর জেলার ৪২ টি হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা যায় ৪ লাখ মেট্রিক টন।
ফলন ভাল হওয়ায় দুই বিঘা জমিতে ৮৫ মণ আলু পেয়েছেন। ভাল দাম না পাওয়ায় এখনও তার বাড়িতে ৫০ মণ আলু রয়েছে। সংরক্ষণের অভাবে সেই আলুতে পচন ধরতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, গ্রামের প্রতিটি কৃষকের ঘরে আলু অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে আছে।
এবার এক কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১৪ থেকে ১৬ টাকা। এসব আলু এবার জমিতে বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ১২ টাকা কেজি দরে। হিমাগার খরচ বৃদ্ধি হওয়ার কারণে অনেকে কৃষক আলু সংরক্ষণের আগ্রহ হারিয়েছেন। অনেকে আবার হিমাগারে আলু সংরক্ষণের সুযোগই পাননি।
বগুড়া সদরের ঘোলাগাড়ি গ্রামের আব্দুল মজিদ বলেন, মৌসুমের শুরুতে দাম ভাল পাওয়া গেলেও এখন আলু বিক্রি করে লেকসান হচ্ছে। তিনি বলেন সাড়ে তিন বিঘা জমিতে পাকড়ি জাতের আলু উৎপাদন হয়েছে ২০০ মণ। আলুর চাহিদা এতটাই কম যে, গরিব মানুষকে বিনামূল্যে দিলেও তা নিচ্ছে না। তাইতো ভাল দামে বিক্রি করতে না পারায় নষ্ট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি লোকসান গুণতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষকেরা বলছেন, এবার মাঠ থেকেই বেশির ভাগ আলু মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে হিমাগারে মজুত করেন। ফলে প্রকৃত চাষীদের আলু রাখার জন্য জায়গা হয়নি হিমাগারে। ফলে বাধ্য হয়ে চাষীরা সনাতন পদ্ধতিতে বাড়িতেই আলু সংরক্ষণ করছেন।
বগুড়ার মহাস্থানহাট ঘুরে দেখা গেছে, পাকড়ি আলু ৪০০ থেকে ৪২০ টাকা এবং সাদা স্টিক আলু ৩৫০ টাকা থেকে ৩৮০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মমতা হক বলেন, বগুড়ায় এই প্রথমবারের মত কৃষকের বসতবাড়িতে প্রাকৃতিক উপায়ে আলু সংরক্ষণের জন্য ৬৭ টি অহিমায়িত ঘর তৈরি করে দেয়া হয়েছে। এই ঘর গুলোতে বিনা খরচে দুই হাজার মেট্রিকটন আলু চার মাস সংরক্ষণ করা যাবে। কৃষক এর সুফল পেলে আগামীতে নিজ নিজ বাড়িতে অহিমায়িত ঘর তৈরি করলে আলু,পিয়াজসহ গ্রীষ্মকালীন বিভিন্ন সবজি সংরক্ষণ করতে পারবে।
হিমাগার মালিকরা জানান, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলায় ৫৫টি হিমাগার রয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টন। এ দুই জেলায় এবার আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২১ লাখ ৩১ হাজার ৫০০ টন (২১৩ কোটি ১৫ লাখ কেজি)।
এ নিয়ে জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মুজিবুর রহমান বলেন, 'এ বছর ৪৩ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর বেশি। আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ লাখ ৫০ হাজার টন।'
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সোহেল মোঃ সামছুদ্দিন ফিরোজ বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলে আলুর ফলন বেশি হয়েছে। আলু চাষও হয়েছে অনেক বেশি জমিতে। যার ফলে বাজারে আলুর দাম তুলনামূলক কম। এত বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণ করতে কৃষকের পাশাপাশি কৃষি বিভাগও হিমশিম খাচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ