
দিগন্তজুড়ে সবুজের সমারোহ ফসলের মাঠ। তার মধ্যে হঠাৎ চোখ পড়ছে কালচে রঙের ধানের ছড়ায়। বাতাসে দুলতে থাকা কালো ধানের শীষ যেন সবুজের বুকে এক টুকরো ব্যতিক্রমী সৌন্দর্য। এমন দৃশ্য চোখে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের বীরচন্দ্রপুর এলাকায় । আবদুল্লাহপুর এলাকার মো: সায়মন মোল্লা নামে এক কৃষক পরীক্ষামূলকভাবে এবার ২ বিঘা জমিতে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ব্যতিক্রমী ব্ল্যাক রাইস ধান চাষ করেন। বর্তমানে পুরো জমিতে ধানের শীষ এসেছে। এখন পযর্ন্ত ফসলের আবস্থা খুবই ভালো রয়েছে। প্রচলিত ধান চাষের বাইরে ব্যতিক্রমী এই জাতের ধান আবাদ করে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। শেষ পযর্ন্ত চাষের ফলন ও ন্যায্যমূল্য পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে এই ধানের আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে ।
এদিকে প্রচলিত ধানের বাইরে নতুন এই জাতের এই ধান চাষকে ঘিরে ইতিমধ্যে কৃষকদের মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন দুরান্ত থেকে লোকজন এ ধান জমি দেখতে আসছেন। তবে চাষাবাদে সফলতা এলে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও অনলাইনভিত্তিক তথ্যের প্রসারের ফলে এখন অনেক কৃষকই ইউটিউবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যম থেকে নতুন জাতের ফসল চাষের ধারণা পাচ্ছেন। এখানে ব্ল্যাক রাইস চাষে তার একটি উদাহরণ।
কৃষক সায়মন মোল্লা বলেন, ছোট বেলা থেকেই ধান চাষের প্রতি বেশ আগ্রহ রয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে দীর্ঘ বছর ধরে ধান চাষ করছি। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মোবাইল ফোনের কল্যাণে ইউটিউবে ব্ল্যাক রাইস ধান চাষ দেখে আমার আগ্রহ তৈরী হয়। এ মৌসুমে নানা প্রতিকুলতা অপেক্ষা করে ব্যতিক্রমী এই ধানের বীজ সংগ্রহ করি। প্রতি কেজি ৫শ টাকায় কেনা হয়।
এরপর বীজতলা তৈরি করে জমি প্রস্তুত করে চারা রোপণ করি। সঠিকভাবে জমিতে পরিচর্যা করায় ধানের ছড়া বের হয়েছে। কোনো কোনো ছড়া বেশ বড় ও পরিপুষ্ট হয়ে উঠছে। আশা করছি ফলন ভালো হবে।
উদ্যোক্তা ছায়মন মোল্লা আরও বলেন, কৃষকদের কাছে ব্ল্যাক রাইস জাতের ধান বীজের ভালো চাহিদা রয়েছে। পুষ্টিগুণের দিক থেকেও কালো চালের আলাদা চাহিদা আছে। পরীক্ষামূলক চাষে আশানুরূপ ফলন পেলে আগামী বছর আরও বড় পরিসরে ব্ল্যাক রাইস চাষ করার আমার পরিকল্পনা রয়েছে। কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে প্রতি বিঘা জমি থেকে ১৬-১৮ মণ ধান হবে বলে আশা করছি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্ল্যাক রাইস মূলত একধরনের বিশেষ জাতের ধান, যার চালের বাইরের স্তর গাঢ় বেগুনি থেকে কালো রঙের হয়ে থাকে। এতে অ্যান্থোসায়ানিন নামের প্রাকৃতিক রঞ্জক উপাদান রয়েছে। এ ছাড়া এতে খাদ্য-আঁশ ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান পাওয়া যায়। এ কারণে সাধারণ চালের তুলনায় এর পুষ্টিগত বৈশিষ্ট্য কিছুটা আলাদা।
ব্ল্যাক রাইস দিয়ে ভাত, পায়েস, খিচুড়ি, পিঠাসহ নানা ধরনের খাবার তৈরি করা হয়। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছেও এ চালের চাহিদা রয়েছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন জাতের ধান চাষের ক্ষেত্রে স্থানীয় মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগিতা, মানসম্মত বীজ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং বাজারের চাহিদা যাচাই করা জরুরি। পরীক্ষামূলক চাষে সফলতা পাওয়া গেলে কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে এর আবাদ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কৃষক মো: বাছির মিয়া বলেন, প্রচলিত ধান চাষের বাহিরে ব্যতিক্রমী ধান চাষ এখানে তেমন দেখা যায় না। এবারই প্রথম দেখেছি এ চাষ। আমার এ চাষ করার বেশ ইচ্ছে তৈরী হয়েছে।
আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: মাসুদ রানা বলেন, ব্ল্যাক রাইস এটি একটি উচ্চ মানের পুষ্টি সম্পন্ন ধান। এটি মূলত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ব্রি কর্তৃক উৎপাদিত একটি নতুন জাত। এ উপজেলায় মৌসুমী ধান চাষের পাশাপাশি স্বল্প জায়গায় পরীক্ষামূলক এ ধান চাষ হয়েছে । ফলন বৃদ্ধিতে কৃষকদেরকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
এটি সম্প্রসারণ হলে কৃষকরা অনেক বেশি লাভবান হবে এবং অনেক দাম পাবে। এধান সম্প্রসারণের জন্য কৃষকদের কারিগরি সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদান করা হবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি