
টাঙ্গাইলের দিগন্তজোড়া মাঠে মাঠে শোভা পাচ্ছে আগাম শীতকালীন সবজির সবুজ সমারোহ। শীত আসতে এখনো বেশ কিছুদিন বাকি থাকলেও আগাম সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়ায় বাম্পার ফলন এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় বুক বাঁধছেন তাঁরা।
বিশেষ করে সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত পাহাড়ি অঞ্চল মধুপুর, ঘাটাইল, ধনবাড়ী ও সখীপুর এবং যমুনা-ধলেশ্বরীর অববাহিকার চরাঞ্চলের কৃষিজমিগুলো এখন হরেক রকমের সবজিতে ভরে উঠেছে।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সারি সারি শাকসবজির আবাদ হচ্ছে। বেশির ভাগ কৃষিজমিতে মূলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, লাউ, টমেটো, লালশাক ও পুঁইশাকসহ বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন সবজি চাষ শুরু হয়েছে। কোথাও কোথাও আগাম জাতের লালশাক, মূলা ও লাউ বাজারে উঠতেও শুরু করেছে।
মৌসুমের শুরুতে বাজারে নতুন সবজির চাহিদা বেশি থাকায় ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষকরা। অধিক ফলন ও কাঙ্ক্ষিত লাভের আশায় কাকডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করছেন কৃষক-কৃষাণীরা। কেউ নতুন চারা রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত করছেন, কেউ চারাগাছের গোড়ায় মাটি দিচ্ছেন, আবার কেউ নিড়ানি দেওয়া ও রোগবালাই দমনে বালাইনাশক স্প্রে করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সবজি পরিচর্যা ও চারা উৎপাদনে পুরুষদের পাশাপাশি সমানতালে ভূমিকা রাখছেন গ্রামীণ নারীরাও।
জেলা শহরের দাইন্যা, বাঘিল, রসুলপুর, কাজীপুর ও সিলিমপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে ব্যাপকভাবে আগাম সবজি চাষ করছেন কৃষক-কৃষাণীরা।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, সাধারণ সময়ের তুলনায় আগাম সবজি বাজারে তুলতে পারলে দ্বিগুণ বা তিন গুণ পর্যন্ত বেশি লাভ করা সম্ভব। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে টাঙ্গাইলে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে আগাম সবজি চাষ বাড়ছে। চরাঞ্চল ও পাহাড়ি অঞ্চলের উর্বর মাটি আগাম সবজি চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় প্রতিবছরই আবাদের পরিধি বাড়ছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব এলাকার সবজি প্রতিদিন ট্রাকবোঝাই করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে সরবরাহ করা হচ্ছে।
দাইন্যা গ্রামের আব্দুল গফুর ও আরফান আলীসহ অনেক কৃষক জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও তাঁরা আগাম শীতকালীন সবজি চাষ শুরু করেছেন। কারণ, আগাম সবজি উৎপাদন করতে পারলে ভালো লাভ পাওয়া যায়। মৌসুমের শেষ দিকে সবজির দাম কমে যাওয়ায় আগাম চাষেই লাভের সম্ভাবনা বেশি।
মধুপুর উপজেলার দরিহাসিল গ্রামের ইমরান আলীর ছেলে কৃষক সবুজ এখন ফুলকপির খেত পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাঁর জমি সবুজে ভরে উঠতে শুরু করেছে। ৮০ শতাংশ জমিতে সারি সারি ক্যাপটেন ও উইনার জাতের ফুলকপির চারা শোভা পাচ্ছে। ১৫ থেকে ২০ দিন আগে তিনি ওই জমিতে ১৮ হাজার ফুলকপির চারা রোপণ করেছেন। এ পর্যন্ত তাঁর খরচ হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার টাকার কিছু বেশি। দুই মাস পর কপি বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি। ভালো ফলন ও ন্যায্যমূল্য পেলে খরচ বাদে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা লাভের প্রত্যাশা করছেন এই কৃষক।
ঘাটাইল উপজেলার সাগরদিঘী ইউনিয়নের ফুলমালীর চালা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, এক মাস আগে তিনি ৪০ শতাংশ জমিতে শিম ও লাউ চাষ করেছেন। গাছগুলো বেশ ভালো হয়েছে এবং কিছু গাছে ফল আসতে শুরু করেছে। এ বছর ভালো ফলন হবে বলে আশা করছেন তিনি। ন্যায্যমূল্যে সবজি বিক্রি করতে পারলে লাভবান হবেন বলেও জানান তিনি।
টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা দুলাল হোসেন জানান, কৃষকদের আগাম সবজি চাষে উৎসাহিত করতে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্দেশনা এবং মানসম্মত বীজ ব্যবহারে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। মাঠের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এবারও জেলায় রেকর্ড পরিমাণ জমিতে শীতকালীন সবজির আবাদ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক কোনো বিপর্যয় না ঘটলে কৃষকরা তাঁদের কঠোর পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন পাবেন এবং ন্যায্যমূল্যে সবজি বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সোয়েব মাহমুদ জানান, এ বছর জেলায় ১১ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব জমি থেকে ২ লাখ ৯৪ হাজার ২২০ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বাড়তি লাভের আশায় কিছু এলাকায় কৃষকরা আগাম শীতকালীন সবজি চাষ শুরু করেছেন। চলতি মাস থেকেই জেলার কৃষকরা শীতকালীন সবজি চাষে পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে এবং কৃষকরাও লাভবান হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ