দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্সেস (TWAS)-এর ফেলো নির্বাচিত হলেন বুয়েটের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. আখতার হোসেন

ড. এ. কে. এম. আখতার হোসেন
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. আখতার হোসেন উন্নয়নশীল দেশসমূহে বিজ্ঞানচর্চার অগ্রগতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান একাডেমি দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্সেস (TWAS)-এর ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর এই ফেলোশিপ আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে কার্যকর হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা, বিজ্ঞানচর্চা এবং বিজ্ঞানশিক্ষার প্রসারে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।
গত ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে TWAS-এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক কোয়ারাইশা আবদুল করিম স্বাক্ষরিত এক আনুষ্ঠানিক পত্রের মাধ্যমে তাঁকে এ নির্বাচনের বিষয়টি জানানো হয়। অভিনন্দন বার্তায় TWAS প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন যে, বিজ্ঞান এবং উন্নয়নশীল বিশ্বে বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে অধ্যাপক হোসেনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে। নবনির্বাচিত ফেলোদের আনুষ্ঠানিক অভিষেক আগামী TWAS সাধারণ সম্মেলনে অনুষ্ঠিত হবে।
অধ্যাপক ড. আখতার হোসেন শিক্ষকতা, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে ১৯৯৮ সালে পরীক্ষণমূলক কঠিন অবস্থা পদার্থবিজ্ঞানে (Experimental Solid State Physics) পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল বিশেষত কলোসাল ম্যাগনেটোরেজিস্ট্যান্স (Colossal Magnetoresistance)। তিনি ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত জাপান সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব সায়েন্স (JSPS) ফেলোশিপের অধীনে জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করেন।
তিনি ১৯৯৪ সালের জুন মাসে বুয়েটের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। বর্তমানে তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বুয়েটের স্নাতকোত্তর শিক্ষা অনুষদের সহযোগী ডিন হিসেবে কর্মরত আছেন। এর আগে তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং বুয়েটের তিতুমীর হলের প্রভোস্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
অধ্যাপক হোসেনের গবেষণার মূল ক্ষেত্র পরীক্ষণমূলক কঠিন অবস্থা পদার্থবিজ্ঞান এবং উন্নত কার্যকরী পদার্থের (Advanced Functional Materials) বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান। তাঁর গবেষণার উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে কলোসাল ম্যাগনেটোরেজিস্ট্যান্স, অতিপরিবাহিতা, ন্যানোস্ট্রাকচার্ড ফেরাইট, ফেরোইলেকট্রিক ও মাল্টিফেরোইক পদার্থ, ডাইলিউট ম্যাগনেটিক সেমিকন্ডাক্টর, ন্যানোক্রিস্টালাইন অ্যালয় এবং নতুন প্রজন্মের কার্যকরী পদার্থ। এসব পদার্থের গঠনগত, বৈদ্যুতিক, চৌম্বকীয় ও ম্যাগনেটোইলেকট্রিক বৈশিষ্ট্য এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক ও প্রযুক্তিগত যন্ত্রে এদের সম্ভাব্য প্রয়োগ নিয়ে তিনি গবেষণা করে আসছেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেশি-বিদেশি স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিক জার্নালে অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি 14 পিএইচডি, 44 এমফিল ও 22 এমএসসি পর্যায়ের গবেষককে তত্ত্বাবধান করেছেন।
তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস (BAS) এবং বাংলাদেশ ফিজিক্যাল সোসাইটির (BPS) ফেলো। TWAS-এর ফেলো নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তাঁর আন্তর্জাতিক একাডেমিক ও গবেষণা জীবনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি যুক্ত হলো।
উল্লেখ্য, দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্সেস (TWAS) একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিজ্ঞান একাডেমি, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ সাধন, গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে কাজ করে থাকে। অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. আখতার হোসেনের এই অর্জন বুয়েট তথা বাংলাদেশের সমগ্র বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষাঙ্গনের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও আনন্দের বিষয়। তাঁর এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের বিজ্ঞান গবেষণা, উচ্চশিক্ষা ও মেধার ক্রমবর্ধমান পরিচিতি ও মর্যাদারই প্রতিফল