
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবস্থিত ঐতিহাসিক পানাম নগরীর ভবনগুলো প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্রমেই জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। কয়েকশ বছরের পুরোনো এসব ভবনের দেয়াল থেকে খসে পড়ছে ইট, সুরকি ও মূল্যবান নকশা। কোথাও কোথাও ধসে পড়েছে ছাদ ও দেয়ালের অংশ। যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা না হলে সাধারণ মাত্রার ভূমিকম্পেও এই প্রত্নসম্পদ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জানা যায়, ২০০১ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পানাম নগরীর কিছু অংশ অবৈধ দখলমুক্ত করে প্রথমবারের মতো সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। তবে সে সময় সংস্কারের নামে নয়টি ভবনের মূল সৌন্দর্য নষ্ট করার অভিযোগ ওঠে অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ভবনগুলোতে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ না করে চুন-সুরকির প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল। এর প্রতিবাদ জানান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল ও স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ওই সংস্কারকাজ বন্ধ হয়ে যায়।
পরে ২০০৩ সালে স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর আন্দোলনের পর পানাম নগরীকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় আসার পরও নগরীটির সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। ২০০৬ সালে ওয়ার্ল্ড মনুমেন্ট ফান্ডের বিশ্বের ধ্বংসপ্রায় ১০০টি ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় স্থান পায় পানাম নগরী।
সম্প্রতি পানাম নগরী ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ভবনের দেয়ালের নকশা খসে পড়েছে। অনেক ভবনের ছাদ ও দেয়ালের অংশবিশেষ ধসে গেছে। ঝুঁকির কারণে ভবনগুলোর ভেতরে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে এসব স্থাপনার ভেতরের স্থাপত্য ও কারুকাজ দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পর্যটকেরা।
নগরীতে টিকে থাকা ৫২টি ভবনের মধ্যে ১০টিকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কর্তৃপক্ষ। ভবনগুলোর সামনে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়েছে।
নগরীর চারপাশের খালগুলোর অবস্থাও নাজুক। স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর ফেলা ময়লা-আবর্জনায় খালগুলো দূষিত হয়ে পড়েছে। এতে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নগরীর উত্তর পাশের খালটি কচুরিপানায় ভরে গেছে। ফলে পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি নগরীর সৌন্দর্যও ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে নগরীর নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত লোকবল প্রয়োজনের তুলনায় কম। এ কারণে ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের হিমশিম খেতে হয়।
বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৬১০ সালের আগপর্যন্ত সোনারগাঁ ছিল বাংলার অন্যতম রাজধানী। এরপর ধীরে ধীরে পানাম নগরী গড়ে উঠতে শুরু করে। মূলত উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ধনাঢ্য হিন্দু জমিদারদের মাধ্যমে নগরীটির গোড়াপত্তন হয়।
পানাম নগরী প্রায় ৬০০ মিটার দীর্ঘ ও ৫ মিটার প্রশস্ত। এখানকার ভবনগুলো এক থেকে তিনতলা পর্যন্ত। এসব ভবনের স্থাপত্যে ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও ভিক্টোরীয় রীতির সঙ্গে মোগল স্থাপত্যের মিশ্রণ দেখা যায়। কিছু ভবনে বাংলার গৌড়ীয় স্থাপত্যরীতির বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। এসব স্থাপনা সোনারগাঁয়ের ইতিহাস ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
পানাম নগরীর সংস্কার ও সংরক্ষণের অন্যতম বাধা হিসেবে বাজেটসংকটের কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মোট বাজেট ৮৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। এর মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় ১৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা। বাকি ৭০ কোটি ৩ লাখ টাকা পরিচালন ব্যয়।
অধিদপ্তরের আওতায় মোট প্রত্নস্থল রয়েছে ৫৫০টি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এতগুলো প্রত্নস্থলের সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য উন্নয়ন বাজেট প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ অবস্থায় পানাম নগরীর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদ রক্ষায় বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল বাদশা বলেন,পানাম নগরী আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। একসময় যে নগরী নাচ-গান, বাণিজ্য ও মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত, আজ সেখানে নেমে এসেছে নীরবতা। যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে এর ঐতিহাসিক সৌন্দর্য। পানাম নগরীর আদি স্থাপত্য ও ঐতিহ্য রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক শাহেদ কায়েস বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে ইতিমধ্যে এ নগরীর ২০টি ভবন সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাকিগুলোও রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্পই এ নগরী ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। পানাম নগরীর আদি সৌন্দর্য ঠিক রেখে অচিরেই এটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা জরুরি।
পানাম নগরের সহকারী কাস্টোডিয়ান মোঃ তানজিলুর রহমান জানান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বাজেট প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই কম। সে জন্য চাইলেই সংস্কার কাজ করা যায় না। তবে পাইলট প্রকল্পের আওতায় দুয়েকটি ভবন সংস্কার করা হয়েছে। আগামীতেও এটি চলমান থাকবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি