
ভারতীয় চলচ্চিত্রে নানা পাটেকরের আলাদা পরিচয় তৈরি হয়েছে তার তীব্র অভিনয়, স্বতন্ত্র সংলাপ বলার ধরন এবং বৈচিত্র্যময় চরিত্র নির্বাচনের কারণে। মারাঠি থিয়েটার থেকে উঠে এসে তিনি হিন্দি ও মারাঠি সিনেমায় একের পর এক ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
কখনো খলনায়ক, কখনো প্রতিবাদী চরিত্র, কখনো পুলিশ কর্মকর্তা, আবার কখনো কমেডি চরিত্রে দেখা গেছে তাকে। তার অভিনীত বেশ কিছু সিনেমা দর্শক ও সমালোচকদের কাছে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আটটি সিনেমা হলো—
১. ‘পরিন্দা’ (১৯৮৯): নির্মম আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন
বিধু বিনোদ চোপড়া পরিচালিত ‘পরিন্দা’ সিনেমায় আন্না চরিত্রে অভিনয় করেন নানা পাটেকর। চরিত্রটিতে ছিল নির্মমতা ও ভয়ংকর এক ধরনের শীতলতা। সেইসঙ্গে আগুনের প্রতি তার চরিত্রের ভয়কে অভিনয়ের মাধ্যমে আলাদা মাত্রা দেন নানা।
এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।
২. ‘ক্রান্তিবীর’ (১৯৯৪): প্রতিবাদের কণ্ঠ
নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত সিনেমা ‘ক্রান্তিবীর’। এতে প্রতাপ নারায়ণ তিলক চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
সামাজিক অবিচার, দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ এক মানুষের চরিত্রে নানার অভিনয় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সিনেমাটির জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তিনি।
৩. ‘তিরঙ্গা’ (১৯৯৩): দেশপ্রেমিক পুলিশ কর্মকর্তা
রাজকুমার কোহলি পরিচালিত ‘তিরঙ্গা’ সিনেমায় নানা পাটেকর অভিনয় করেন পুলিশ কর্মকর্তা শিবাজিরাও ওয়াগলে চরিত্রে। সিনেমাটিতে তার সঙ্গে অভিনয় করেন রাজকুমার।
নানার শক্তিশালী সংলাপ উপস্থাপন এবং রাজকুমারের সঙ্গে তার দৃশ্যগুলো সিনেমাটির অন্যতম আলোচিত দিক হয়ে ওঠে। অ্যাকশন ও দেশপ্রেমের আবহে নির্মিত সিনেমাটিতে তার অভিনয় দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়।
৪. ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ (১৯৯৬): নীরব অভিনয়ের শক্তি
সঞ্জয় লীলা বানসালির পরিচালনায় নির্মিত ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ ছিল তার পরিচালিত প্রথম সিনেমা। এতে নানা পাটেকর অভিনয় করেন জোসেফ চরিত্রে, যিনি একজন বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী বাবা।
চরিত্রটির আবেগ প্রকাশে সংলাপের চেয়ে মুখের অভিব্যক্তি ও শারীরিক ভাষার ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে তাকে। নানার এই অভিনয় তার বহুমাত্রিক অভিনয়ক্ষমতার আরেকটি দিক সামনে আনে।
৫. ‘আব তক ছাপ্পান’ (২০০৪): এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট
‘আব তক ছাপ্পান’ সিনেমায় মুম্বাই পুলিশের এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট সাধু আগাশে চরিত্রে অভিনয় করেন নানা পাটেকর।
চরিত্রটি ছিল সংযত, কঠোর ও বাস্তবধর্মী। বাড়তি নাটকীয়তার বদলে নিয়ন্ত্রিত অভিনয়ের মাধ্যমে একজন পুলিশ কর্মকর্তার মানসিকতা ও কাজের ধরন তুলে ধরেন নানা। সিনেমাটিতে তার অভিনয় ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
৬. ‘ওয়েলকাম’ (২০০৭): উদয় শেঠির কমেডি
নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারে ‘ওয়েলকাম’ একটি ভিন্নধর্মী সংযোজন। গম্ভীর ও তীব্র চরিত্রের জন্য পরিচিত নানা এখানে উদয় শেঠি চরিত্রে কমেডি অভিনয় করেন।
অনিল কাপুরের মজনু ভাই চরিত্রের সঙ্গে তার জুটি দর্শকদের ব্যাপক বিনোদন দেয়। দুজনের সংলাপ, অভিব্যক্তি ও পরিস্থিতিনির্ভর অভিনয় সিনেমাটিকে জনপ্রিয় করে তোলে। উদয় শেঠি চরিত্রের নানা সংলাপ পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
৭. ‘রাজনীতি’ (২০১০): পর্দার আড়ালের কৌশলী
প্রকাশ ঝা পরিচালিত রাজনৈতিক থ্রিলার ‘রাজনীতি’তে নানা পাটেকর অভিনয় করেন ব্রিজগোপাল চরিত্রে। মহাভারতের কৃষ্ণের আদলে নির্মিত এই চরিত্রটি সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে না থেকেও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে প্রভাব রাখে।
নানা পাটেকরের সংযত ও গম্ভীর অভিনয় চরিত্রটিকে আলাদা করে তুলে ধরে। সিনেমাটির রাজনৈতিক আবহের সঙ্গে তার চরিত্রের কৌশলী ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
৮. ‘নটসম্রাট’ (২০১৬): মঞ্চ অভিনেতার জীবনের ট্র্যাজেডি
মারাঠি সাহিত্যের জনপ্রিয় নাটক ‘নটসম্রাট’ অবলম্বনে নির্মিত একই নামের সিনেমায় গণপতরাও বেলওয়ালকর চরিত্রে অভিনয় করেন নানা পাটেকর।
একজন অবসরপ্রাপ্ত মঞ্চ অভিনেতার বার্ধক্য, পরিবার, সম্পর্ক ও অভিনয়জীবনের স্মৃতি ঘিরে এগিয়েছে গল্প। চরিত্রটির আবেগ, একাকিত্ব ও মঞ্চের প্রতি টানকে নানা গভীর অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন। সিনেমাটি তার মারাঠি অভিনয়জীবনের অন্যতম আলোচিত কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
নানা পাটেকরের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি ছিল চরিত্রের বৈচিত্র্য। ‘পরিন্দা’র নির্মম খলনায়ক থেকে ‘আব তক ছাপ্পান’-এর কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা, ‘রাজনীতি’র কৌশলী চরিত্র কিংবা ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠি—প্রতিটি চরিত্রেই আলাদা অভিনয়শৈলী দেখা গেছে তার।
তীব্র ও গম্ভীর চরিত্রের পাশাপাশি কমেডিতেও নিজের সক্ষমতা দেখিয়েছেন নানা। আর ‘নটসম্রাট’-এর মতো সিনেমায় বয়স, একাকিত্ব ও অভিনয়জীবনের আবেগকে সামনে এনে তিনি নিজের অভিনয়ের আরেকটি দিক তুলে ধরেছেন।
১৯৯৭ সালে ‘অগ্নিসাক্ষী’ সিনেমার জন্য নানা পাটেকর তার তৃতীয় এবং সর্বশেষ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি