ড. শিবশঙ্কর পাল

যাঁরা ধনঞ্জয় সাহার ‘‘পাঁচ দশকের পাঁয়তারা’ বইটি হাতে নিয়েছেন তাঁরা জানেন যে বইটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খচিত পূর্ণিমা রাতের আকাশের মতো। যা চমক স্নিগ্ধতা আর ঋদ্ধতার ছায়াঘর। যার অঙ্গ-আত্মা বলে, ধনঞ্জয়ের ছড়াবিতা পোস্ট মর্ডান। আল্ট্রা মর্ডান। সম্প্রসারণশীল। বহুস্তরীয় লৌকিকতার পটচিত্র। যেন Daily News Paper-এর হাতচিঠি। সেখানে আছে চলমান সমাজনীতি, পেটের টান, হাঁড়ির খবর, Flash Back. আছে Slide Show দেখিয়ে Short Film-এর ঝলক—
‘সায়ক দিয়ে মারলে নায়ক ধর্ম দিয়ে গুরু
ধর-পাকড়ের সায়েব নায়েব
মিথ্যাচারে শুরু।’
সংবেদনশীল, সমাজমনস্ক কবি ধনঞ্জয় সাহা। সমাজের দর্পন ধনঞ্জয়ের কবিতা। একতারার এক তারে বাঁধা যেন প্রতিটি বাক্য৷ এক টানে যেখান সুর ওঠে —
‘সত্য কথা জানা এখন খুব দরকার
তেল প্রয়োজন নয়া, পুরানা সব চরকার
গোয়েন্দা পুলিশ বিচারক কোর্ট বর্ষীয়ান পেশকার
দেখা না হলে ফিক, ঠিক ফেঁসে দেন কেস তার।’ (আলবাত)
বইটিতে পাই শক্তি, শঙ্খের শব্দস্বর। অন্নদাশঙ্কর, নীরেন্দ্রনাথ থেকে একটু এগিয়ে আত্মশুদ্ধির অ্যালার্ম। ছড়া হয়ে ওঠে ছড়ি। বেহিসাবের হিসাব। নষ্ট ফুলের পরাগ। বিবেকবোধে জাগিয়ে তুলতে, আত্মচিন্তায় মগ্ন হতে কবি বলেন—
‘নষ্ট থেকে সরতে হলে কষ্ট করে
ঘরে ফিরে আবার তুমি অঙ্ক কষো।’
বইটির নামকরণই একটা স্যাটায়ার। পাঁয়তারা শব্দেই লুকিয়ে আছে সমাজের মাতবরদের মুখোশ। স্বেচ্ছাচারী, ক্ষমতাধারী, ফন্দিবাজদের কালো উইল।
এই বইয়ের শব্দমহল গ্রামীণ মানুষের মুখ-শব্দ। লোকশব্দের সংরক্ষণ যেন। শব্দের নতুন সৃষ্টি— ‘পাকা কিল’, ‘হাওয়ার পিল’, ‘হাতি-পাতি নেতা’। পক্ষান্তরে গুরুভার বিষয়কে ছন্দের লঘু আঁচে তুলে ধরেছেন লেখক। সোচ্চারও হয়েছেন। বলছেন—
‘সাথে যদি থাকো তুমি
উপরে দেবো বদ্ধভূমি
সব লায়েকের কথা ভেলা…
ভেঙে দেবো টাকায় গড়া
অলংকারের জাজিম গদি।’
বইটিতে হিউমরের সঙ্গে আছে দেশভাবনা। দুলকি চালের স্মৃতি কাতরতা, প্রেম-মেদুরতা। গ্রাম বাংলা। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত রসে চোবানো গহীন মন্ময়তা। ফিরে-দেখা—
‘কাজান বাড়ির বাজান ছিলো
এখানে এক মাজার ছিলো
গমগমে এক বাজার ছিলো
কিলো কিলো সবজি ছিলো
কোথায় গেল কোথায় গেল।’
বহুমাত্রিক বহুকৌণিক চিন্তাধারার কবি ধনঞ্জয় সাহা। তিনি সিরিয়াস, অকপট, কখনও ফুরফুরে। বাক্যগঠনে অভিনবত্ব সন্ধানী। বিষয়ে নিরেট নির্যাসী। সেখানে আছে শব্দের ডিগবাজি। যা ভনিতার ভাঁড়ার সাজায় না। তুলে ধরে জীবনের ধর্ম কর্ম মর্ম।
ধনঞ্জয় সাহা ছড়ার গতানুগতিক আঙ্গিকে পালাবদল ঘটিয়েছেন। এনেছেন নিজস্ব রীতি। তা যেন Integrated হয়ে কবিতা গল্প নাটকের সারাংশে পরিণত হয়েছে। সেখানে এসেছে ভূগোল, ইকোনমিক্স, সোসোলজি, পলিটিক্স, যা All Inclusive.
সর্বোপরি ধনঞ্জয়ের ছড়াবিতা সমাজসংস্কারের কাজ করে। মানসিকতা পরিশুদ্ধি, মানবিকতা প্রত্যাবর্তন, জীবনের গান গায়—
‘লেখার মাঝে লুকিয়ে রাখি সাদা বেলির কঙ্ক মালা…
তোমার জন্য রেখে গেলাম
ভোরের বাতাস হলুদ গাঁদার গন্ধে-সতেজ বরণডালা।’ (ভালো থেকো)
শেষে বলতেই হয় ধনঞ্জয় সাহার ছড়াবিশ্ব নতুন চিন্তা নিয়ে নতুন ধারার নতুন সৃষ্টি। তিনি আধুনিক ছড়াবিতার রূপকারের দাবিদারও।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ