
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার প্লাবনভূমিতে দেশে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ শুরু হয়। জলাবদ্ধতার কারণে বছরের বড় একটি সময় যে জমিগুলো অনাবাদি পড়ে থাকত, সেসব জমিতে মাছ চাষ করে এখন লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। বর্ষা মৌসুমে ধানক্ষেতে মাছ চাষ এবং শুকনো মৌসুমে একই জমিতে ধান উৎপাদন করায় একটি জমি থেকেই সারা বছর আয় করছেন তারা। দাউদকান্দির এই উদ্যোগ বর্তমানে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক-সংলগ্ন দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জ, পুটিয়া, রায়পুর, সিংগুলা, লক্ষ্মীপুর, সুহিলপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে মাছের প্রকল্প। এসব এলাকায় শতাধিক মৎস্য প্রকল্পে রুই, মৃগেল, কাতলা, সিলভার কার্প, সরপুঁটি, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উৎপাদন হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে জলাবদ্ধতার কারণে বছরের আট-নয় মাস এসব জমি খালি পড়ে থাকত। এক ফসলের বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হতো না। সেই জলাবদ্ধতাকেই কাজে লাগিয়ে শুরু হয় মাছ চাষ।
স্থানীয়ভাবে জানা যায়, ১৯৮৬ সালে দাউদকান্দি উপজেলার হাসের খোলা গ্রামের সুনীল কুমার রায় প্রথম প্লাবনভূমিতে মাছ চাষ শুরু করেন। তার উদ্যোগ দেখে পরে অন্যরাও মাছ চাষে এগিয়ে আসেন। ধীরে ধীরে এটি বাণিজ্যিক রূপ নেয়। মাছ উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন। বিশেষ করে শিক্ষিত ও বেকার যুবকদের একটি অংশও মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
মাছ চাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, দাউদকান্দির উৎপাদিত মাছ ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। তবে মাছ সংরক্ষণের জন্য এলাকায় একটি হিমাগার প্রয়োজন। বাজারে দাম কম থাকলে বা কোনো কারণে মাছ বিক্রি করতে দেরি হলে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় চাষিদের সমস্যায় পড়তে হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় সড়কের খারাপ অবস্থার কারণেও মাছ পরিবহনে ভোগান্তি পোহাতে হয়।
মৎস্য চাষি ও স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত উদ্যোক্তা মতিন সৈকত বলেন, ‘বর্ষাকালের বন্যার পানি একসময় এই এলাকার অভিশাপ ছিল। সেই অভিশাপ এখন আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে। প্লাবনভূমিতে মৎস্য চাষ দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখবে।’
কুমিল্লার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওয়াহিদুর রহমান মজুমদার বলেন, দাউদকান্দিতে শতাধিক মৎস্য প্রকল্প রয়েছে। শিক্ষিত বেকার যুবকরাও মাছ চাষে সম্পৃক্ত হচ্ছেন, ফলে বেকারত্ব কমছে। প্রকল্পগুলোর উন্নয়নে মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
চাষিরা জানান, মাছ চাষ আরও সম্প্রসারণের জন্য মরা খাল সংস্কার এবং মাছ সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপন জরুরি। তাদের দাবি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দাউদকান্দির প্লাবনভূমিতে মাছ চাষ আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারিত হতে পারে।
প্লাবনভূমির জলাবদ্ধ জমিকে উৎপাদনের আওতায় এনে মাছ চাষের মাধ্যমে দাউদকান্দির অনেক মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সুবিধা বাড়ানো গেলে এই মৎস্য খাত স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি