রবিবার ● ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
● চাঁদাবাজি মামলায় দুই সাংবাদিক কারাগারে      ● মোজতবা খামেনির বেঁচে ফেরার নেপথ্যে ভয়াবহ সেই হামলা      ● দুই মাসে ৮৬২৬ কোটি টাকার বিদেশি ঋণ পরিশোধ      ● জানুয়ারিতে সংবিধান সংশোধন বিল, পাস হলে হবে গণভোট      ● নিজের নাম দেখে স্কুল ভবন উদ্বোধন না করেই ফিরলেন      ● জয়ের ১০তম জন্মদিনে শাকিব-অপুর ভালোবাসার বার্তা      ● স্কুলছাত্রীর দাঁত ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত গ্রেফতার      ● নদীর পাড় থেকে গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ      ● ৭ জলাশয়ে ২২৩ কেজি পোনা মাছ অবমুক্ত      ● পর্যটনের সম্ভাবনা পাহাড়জুড়ে      ● শরীর নিয়ে কটাক্ষের জবাব ‘মোটি’ লেখা ব্লাউজে স্বরার      ● ঢাকা কলেজ-আইডিয়াল কলেজ শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ      
ছোট ফাঁসে ধ্বংস ইলিশের ভবিষ্যৎ
প্রতিনিধি, বাউফল (পটুয়াখালী)
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৭ পিএম

ভরা মৌসুমেও পটুয়াখালীর বাউফলের তেঁতুলিয়া নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না। জাল ফেলেও আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় হতাশ জেলেরা। এর মধ্যেই নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে চলছে বাঁধা জাল, বেহন্দি, ছোট ফাঁসের কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি দিয়ে মাছ শিকার। এসব জালে ইলিশের পোনাসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের পোনা ও জলজ প্রাণী নির্বিচারে ধরা পড়ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের উৎপাদন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে হয় ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন নেমে এসেছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ টন।

সাধারণত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরকে ইলিশের ভরা মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। অথচ এ সময়েও দক্ষিণ অঞ্চলের নদ-নদীতে ইলিশের কাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি নেই।

সরেজমিনে নদীবেষ্টিত চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চরকচুয়া, চর রায়সাহেব, চর ব্যারেট ও চর নিমদি এলাকায় ছোট ফাঁসের বাঁধা জাল, কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি ও মশারি জাল দিয়ে মাছ ধরতে দেখা গেছে। এসব জালে ইলিশের পোনার পাশাপাশি গলদা চিংড়ি, পাঙ্গাশ, আইড়, বোয়ালসহ বিভিন্ন দেশীয় ছোট মাছ আটকা পড়তে দেখা যায়। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে উপজেলার কাছিপাড়া, কারখানা, ধুলিয়া ও বাঁশবাড়িয়া এলাকার নদীসংলগ্ন পয়েন্টগুলোতেও।

জেলেদের অভিযোগ, দিন-রাত নদীর বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ জাল পেতে মাছ শিকার চলছে। এতে বড় মাছের পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে ভবিষ্যতের মাছের মজুত। তাদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও বর্ষা মৌসুমে তেঁতুলিয়ায় ইলিশের ভালো সরবরাহ থাকলেও এখন ভরা মৌসুমেও অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।

জেলে মোশারফ বলেন, ‘আমরা সবসময়ই নদীনির্ভর। আগে বর্ষার শুরু থেকে ভাদ্র-আশ্বিনের মাঝামাঝি পর্যন্ত নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। এখন ভরা মৌসুমেও জাল ফেলে খালি হাতে ফিরতে হয়। বাঁধা জাল ও চায়না জালে বড় মাছের সঙ্গে ছোট মাছ ও পোনা সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’

জেলে মামুন ও মাঈনুদ্দিন মাঝী বলেন, ‘নদীর প্রধান মোহনায় বাঁধা জাল পাতা হয়। আবার গভীর সাগরে ট্রলিংয়ের কারণে মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। নদীতে মাছ কম থাকায় দাদনের টাকা পরিশোধ ও শ্রমিকের মজুরি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’

ইলিশের সরবরাহ কমার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় আড়ৎগুলোতেও। আড়ৎ মালিক ও মাছ ব্যবসায়ী বেল্লাল হোসেন বলেন, ‘আগের তুলনায় এখন ইলিশের সরবরাহ অনেক কম। জেলেরা অনেক সময় জালভর্তি অন্যান্য ছোট মাছ নিয়ে আসছেন, কিন্তু ইলিশ থাকছে খুবই কম। সরবরাহ কম থাকায় দামও বাড়ছে।’

তবে নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে অভিযান নেই, এমন নয়। চলতি বছরের জুলাই থেকে চলতি মাসে বাউফলের বিভিন্ন বর্ষাপ্লাবিত ধানক্ষেত, নদী, খাল ও বিলে অভিযান চালিয়ে বাঁধা জালসহ প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার পিস নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করে মৎস্য বিভাগ। এর মধ্যে ৫ থেকে ৭টি বাঁধা জাল ছিল। জব্দ জালের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৭০ লাখ টাকা। পরে জালগুলো পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।

বাউফল উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এম এম পারভেজ বলেন, ‘চায়না দুয়ারি, কারেন্ট জাল ও নির্দিষ্ট ফাঁসের নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরা আইনত দণ্ডনীয়। তেঁতুলিয়া নদীতে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের অভিযোগ আমাদের নজরে রয়েছে। জনবল সংকট থাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হলেও নিষিদ্ধ জাল জব্দ ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

তেঁতুলিয়ায় ভরা মৌসুমেও ইলিশ কম পাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নদীর নাব্যতা সংকট ও প্রধান মোহনা শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রবেশে প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করা হচ্ছে।’

এদিকে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম সামনে রেখে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ থাকবে। এ সময়ে ইলিশ সংরক্ষণে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করা হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এ ২২ দিনের এ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বলেন, ‘নিষিদ্ধ জাল বিক্রি বন্ধে বিভিন্ন বাজারে নিয়মিত অভিযান করা হয়। বিভিন্ন সময় অবৈধ জাল আটক করে ধ্বংসও করা হয়েছে। এ ছাড়া নদীতে তদারকি বৃদ্ধির জন্য মৎস্য অফিসকে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া আছে। আগামীতে আরও বেশি পরিসরে অভিযান করা হবে।’

বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মৎস্য বিভাগের প্রতিটি অভিযানে আমাদের পুলিশ টিম সহযোগিতা করে। নদীতে অবৈধভাবে মাছ শিকার বন্ধে আইন অনুযায়ী প্রতি মাসে ৫ থেকে ৭টি মামলা করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

তেঁতুলিয়া নদীতে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার ও ছোট মাছ ধ্বংসের বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, ‘নিষিদ্ধ জালে নির্বিচারে মাছ আহরণে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তার ব্যাহত হয়। বিশেষ করে ছোট ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মাছ ধরা পড়ায় ভবিষ্যতে প্রজননক্ষম মাছের মজুত কমে যেতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তেঁতুলিয়ার পাশাপাশি আগুনমুখা, আন্ধারমানিক, রাবনাবাদ ও বুড়িশ্বরসহ জেলায় প্রায় ১৯টি নদী রয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় সব নদী ও প্রত্যন্ত এলাকায় নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান চালানো কঠিন। এ কারণে অভিযোগ থাকলেও সব এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে অবৈধ জাল নির্মূল করা সম্ভব হয় না। তবে নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট নদী উপকেন্দ্র, পটুয়াখালীর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উপকেন্দ্র প্রধান ড. কাজী বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এসব অবৈধ জালে ছোট-বড় সব মাছ একসঙ্গে ধরে ফেলা হচ্ছে। ফলে পরবর্তী বংশবিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় মা মাছের সংখ্যা কমে গেছে। এতে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের প্রাপ্যতা কমে যায়। পাশাপাশি নদীতে বর্জ্য, পলিথিন, প্লাস্টিক ও ছোট-বড় ডুবোচরের কারণে মাছের চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণেও দেশীয় নদীতে মাছের প্রবাহ কমে গেছে।’

স্থানীয় জেলেদের দাবি, তেঁতুলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান বাড়ানোর পাশাপাশি নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের মতে, আজকের ছোট মাছ রক্ষা করা না গেলে আগামী দিনের বড় মাছও রক্ষা করা যাবে না। নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ না হলে ইলিশসহ দেশীয় মাছের সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।






স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close