
সিলেটে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে হাম সংক্রমণ। আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ঘুরছেন অভিভাবকরা। রোগীর চাপে এক বিছানায় একাধিক শিশু, এমনকি মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। গত ছয় মাসে হাম উপসর্গ নিয়ে মৃত অন্তত তিনটি শিশুর অভিভাবক অভিযোগ করেন, হাসপাতালে আনার পরও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সময়মতো আইসিইউ না পাওয়ায় মৃত্যু হয়েছে তাদের সন্তানের।
বছরের সাড়ে আট মাসে সিলেটে হাম উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৭৩ শিশুর। বুধবার পর্যন্ত বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৬০০ জন। চলতি সপ্তাহে সংক্রমণ আরও বেড়েছে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৬৪ জন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছিল ১৬৮ জন। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও সংক্রমণ বাড়ছে।
সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে হাম চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ ১০০ শয্যা। তবে হাসপাতালে ভর্তি আছে ২০০-র বেশি রোগী। এর মধ্যে বেশির ভাগই শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন ৩৬ জন। সবারই হাম উপসর্গ।
শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক খসরুজ্জামান রনি বলেন, আসন সংখ্যার চেয়ে বেশি রোগী রাখতে হচ্ছে, প্রতিদিন রোগী বাড়ছে, এটা অবশ্যই উদ্বেগজনক। তবে টিকা কার্যক্রম চালু আছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অপেক্ষা আর সচেতনতার ওপরই জোর দিতে হচ্ছে। আর সেবার ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ দেওয়ারই চেষ্টা করি।
হাম উপসর্গ থাকলে বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল রোগী রাখছে না। রোগীর চাপে সিলেটের প্রধান দুই সরকারি হাসপাতালে সংক্রমিত একাধিক শিশুকে এক বিছানায় রেখে সেবা দেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ ও এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেঝেতেও থাকছেন অভিভাবকরা।
দশ মাসের শিশুকে নিয়ে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের মেঝেতে বিছানা পেতেছেন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের রুবিনা বেগম। তিনি জানান, টিকার কথা শুনেছেন, তবে কোথায় দিতে হয় জানেননি, তাই সন্তানকে টিকা দেননি। আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে যান। অবস্থা খারাপ হলে সিলেট নগরীর অন্তত দুটি হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত এখানে ভর্তি হতে পেরেছেন।
রুবিনা বেগম বলেন, ‘অন্য হাসপাতালে ভর্তি নিছে না, দুই দিন হইসে ইনো ভর্তি হইসি, কিন্তু সিট নাই। নিচে আছি, হাসপাতালে একটা চাদর দিছে।’
তবে চিকিৎসায় সন্তানের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগে খাইতে চাইতো না, এখন খাইতে পারে।
বিভাগের চার জেলাতেই সমান হারে বাড়ছে সংক্রমণ। তবে বেশি সংক্রমিত হচ্ছে সুনামগঞ্জ ও সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হামের টিকাবঞ্চিত শিশুরা। হাসপাতালে আসা হাম আক্রান্ত শিশুদের বেশির ভাগই টিকা পায়নি।
হাম উপসর্গ নিয়ে সিলেটে ১৭৩ জনের মৃত্যু হলেও ল্যাব টেস্টে এদের মধ্যে মাত্র ১০ জনের হাম নিশ্চিত করা হয়েছে। বাকি শিশুদের মৃত্যুর জন্য হাম উপসর্গের সঙ্গে অন্যান্য শারীরিক জটিলতাকে দায়ী করা হয়েছে। তবে পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় প্রেরণের জটিলতার কারণে অনেকের হাম পরীক্ষা হয় না।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের হাম ও রুবেলা সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর সিলেটে নিশ্চিতভাবে হাম সংক্রমিত হয়েছেন ১ হাজার ৫৩ জন। তাদের মধ্যে সিলেটে ৩৮৫, সুনামগঞ্জে ৩৫৭, মৌলভীবাজারে ১৫৮ এবং হবিগঞ্জে ১৫৩ জন। আর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে সিলেটের ৬৮, সুনামগঞ্জের ৬৬, হবিগঞ্জের ২৪ ও মৌলভীবাজারের ১৫ শিশু।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হওয়া ১৬৪ রোগীর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৭০ জন এবং ৬২ জন ভর্তি হন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বাকিরা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ