
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে বসবাসরত ৫১ বছর বয়সী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আওলাদ হোসেনকে বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ (এএফপি)। অভিযোগ, বাংলাদেশে তার স্ত্রীর সন্দেহজনক মৃত্যুর তদন্তে প্রভাব বিস্তার এবং পুলিশি নথি থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি প্রায় ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার পাঠিয়েছেন।
এএফপির অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই বছরে আওলাদ হোসেন বাংলাদেশে পরিচিত কয়েকজনের কাছে ৯০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ পাঠান। এসব অর্থের একটি অংশ বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল বলে পুলিশের অভিযোগ।
এএফপি জানিয়েছে, রেহানা পারভিন নামের এক অস্ট্রেলিয়ান-বাংলাদেশি নাগরিক ও পাঁচ সন্তানের মা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নিখোঁজ হন। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের একটি গ্রামে তার মরদেহ পাওয়া যায়। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের ফরেনসিক পরীক্ষায় মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তার মৃত্যুকে সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপর অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশ—দুই দেশের কর্তৃপক্ষ পৃথকভাবে ঘটনাটির তদন্ত শুরু করে।
এএফপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কুইন্সল্যান্ড পুলিশ সার্ভিসের কাছ থেকে ওই নারীর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়ার পর প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি। বাংলাদেশে মরদেহ শনাক্ত এবং মৃত্যুর ধরন নিয়ে সন্দেহের তথ্য পাওয়ার পর তদন্তটি অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ ক্রিমিনাল কোডের অধীনে বিদেশে অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকের মৃত্যুসংক্রান্ত গুরুতর অপরাধের দিকে নেওয়া হয়।
তদন্তের অংশ হিসেবে এএফপি সিডনি ও ব্রিসবেনের কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের নথি ও ব্যাংক রেকর্ড জব্দ করে। এসব আর্থিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণের পর বাংলাদেশে চলমান তদন্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সামনে আসে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর এএফপির সদস্যরা কুইন্সল্যান্ডের গুডনা ও রেডব্যাংক প্লেইন্স এলাকায় কয়েকটি বাড়িতে অভিযান চালান। এ সময় আওলাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইসও জব্দ করা হয়েছে, যা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে।
আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিমিনাল কোডের ৭০.২(১) ধারায় বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার একটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ধারায় বিদেশি সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে বেআইনি সুবিধা দেওয়াকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এএফপি কমান্ডার স্টিফেন জে বলেন, গুরুতর কোনো অপরাধের তদন্তের ফলাফল প্রভাবিত করতে ঘুষ বা দুর্নীতির চেষ্টা করা হলে তা অস্ট্রেলিয়া ও বিদেশ—উভয় ক্ষেত্রেই গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। তদন্তে প্রভাব বিস্তারের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এএফপির সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
তবে এএফপি জানিয়েছে, কোনো বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তা ওই অর্থ গ্রহণ করেছেন বা কথিত ঘুষের অর্থ তদন্তে কোনো প্রভাব ফেলেছে—এমন প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে চলমান তদন্তকে প্রভাবিত করার কথিত প্রচেষ্টা সফল হয়নি। রেহানা পারভিনের মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশ পুলিশও পৃথকভাবে তদন্ত করছে।
এদিকে আওলাদ হোসেনের আইনজীবী তোরিক ডিব জানিয়েছেন, তার মক্কেল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং আদালতে অভিযোগের বিরুদ্ধে লড়বেন। ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার জামিনের আবেদন আগামী মাসে শুনানির জন্য নির্ধারিত হতে পারে।
রেহানা পারভিনের মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের তদন্তের পাশাপাশি এএফপির তদন্তও চলমান রয়েছে। এখন পর্যন্ত আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে হত্যার অভিযোগে কোনো দণ্ড বা অস্ট্রেলিয়ায় হত্যার অভিযোগে বিচার হয়নি। তার বিরুদ্ধে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটি বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এএফপির ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করার ক্ষেত্রে এটি সংস্থাটির প্রথম ঘটনা।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি