
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ পরিচালনা নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে হওয়া একটি চুক্তির প্রস্তাব নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে। ‘সর্বসম্মত ঐকমত্যের স্বার্থে’ সোমবারের বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়িদ বদর আল-বুসাইদি। এতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ পরিচালনার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে করা চুক্তির প্রস্তাব উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সামনে তুলে ধরার জন্য বৈঠকটি আয়োজন করা হয়েছিল। ইরানের ফার্স বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান ও মাস্কাটের যৌথ সিদ্ধান্তে এবং কয়েকটি দেশের অনুরোধে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। নতুন তারিখ নির্ধারণে ইরান ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করবে বলেও জানানো হয়েছে।
বৈঠক স্থগিতের খবর এমন সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলো নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। শুক্রবার ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সৌদি আরবের প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ রাখা হয়েছে। এই পাইপলাইন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, রোববার হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজে প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং নাবিকদের সরিয়ে নিতে হয়। ইরানও জানিয়েছে, তাদের উপকূলের কাছে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় একজন নিহত ও চার নাবিক আহত হয়েছেন।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। সোমবার বাজার খোলার পর তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বৃদ্ধিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত সপ্তাহে জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
সৌদি আরবের তেল সরবরাহ নিয়ে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশটির লোহিত সাগরীয় বন্দর ইয়ানবু দিয়ে রপ্তানি চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত তেল মজুত রয়েছে। তবে এই মজুত পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলে বিঘ্নের কারণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সৌদি আরব ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনটি কতদিন বন্ধ থাকবে বা ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। বিভিন্ন সূত্র মেরামতের সময় নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন ধারণা দিয়েছে। কারও মতে কয়েক দিন, আবার কারও মতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। স্যাটেলাইট চিত্রেও পাইপলাইনের বিভিন্ন স্থান থেকে বড় আকারের ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলেও যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের দাবিগুলো পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি বড় ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণও কাজ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতা। সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান প্রদেশে আন্তঃসীমান্ত হামলায় বাড়িঘর ও একটি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর দাবিও করেছে।
বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি এই নৌপথেও অস্থিরতা বাড়লে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যও বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে সৌদি আরবসহ মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা ও নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে নতুন কোনো বড় সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চাপও বাড়ছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে বৈঠক স্থগিত হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারে এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি