
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষণের পর ৪ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থী ফেল থেকে পাস করেছেন। নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩ হাজার ৭৯ জন। এ ছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে আরও অনেক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ড পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশ করে। এর আগে গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার মূল ফল প্রকাশ করা হয়। ফল প্রকাশের পর ১৭ আগস্ট পর্যন্ত উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করার সুযোগ ছিল।
এবার রেকর্ডসংখ্যক শিক্ষার্থী উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেন। তবে পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশের পরও কেউ সন্তুষ্ট না হলে একই উত্তরপত্র আবার পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, একই উত্তরপত্র দ্বিতীয়বার পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ নেই। তবে পুনঃনিরীক্ষণের ফল নিয়েও কোনো শিক্ষার্থী সন্তুষ্ট না হলে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানূ বিবিসি বাংলাকে বলেন, একটি উত্তরপত্র কয়েকটি ধাপে মূল্যায়ন ও যাচাই করার পর ফল প্রকাশ করা হয়। এরপর পুনঃনিরীক্ষণও বোর্ডের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী করা হয়। তাই একই খাতা আবার দেখার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, বোর্ডের নির্ধারিত নীতিমালার বাইরে গিয়ে দ্বিতীয়বার পুনঃনিরীক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। এরপরও কোনো শিক্ষার্থী ফলাফলে সন্তুষ্ট না হলে তাকে আদালতে যেতে হবে।
একই কথা জানিয়েছেন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজা। তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী আদালতে রিট করলে এবং আদালত উত্তরপত্র পুনরায় দেখার নির্দেশ দিলে বোর্ডকে সেই নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
কেন দ্বিতীয়বার পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ নেই
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি উত্তরপত্র শুরু থেকেই কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে যায়।
প্রথমে পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন। এরপর প্রধান পরীক্ষক সেটি যাচাই করেন। পরে নিরীক্ষক নম্বরের হিসাব সঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করেন।
এরপর কোনো শিক্ষার্থী পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করলে আরেকজন পরীক্ষকের মাধ্যমে উত্তরপত্র পুনরায় মূল্যায়ন করা হয়।
অর্থাৎ, পুনঃনিরীক্ষণসহ একটি উত্তরপত্র মোট চারটি ধাপের মধ্য দিয়ে যায়। এ কারণে পুনঃনিরীক্ষণের পর একই উত্তরপত্র আবার দেখার সুযোগ রাখা হয়নি বলে জানিয়েছে শিক্ষা বোর্ড।
এবার পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন কত
চলতি বছর দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন।
মূল ফল প্রকাশের পর উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেন ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ জন পরীক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীও ছিলেন।
একজন পরীক্ষার্থী একাধিক বিষয়ের উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করতে পারেন। ফলে আবেদনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় পুনঃনিরীক্ষণের জন্য জমা পড়া উত্তরপত্রের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।
এবার লিখিত পরীক্ষার ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা হয়। সব মিলিয়ে পুনঃনিরীক্ষণের আওতায় আসে ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি উত্তরপত্র।
এত বিপুলসংখ্যক আবেদন নিয়ে এর আগে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও পুনঃনিরীক্ষণের জন্য নতুন নীতিমালা তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
ভবিষ্যতে বদলাতে পারে মূল্যায়ন পদ্ধতি
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এবারের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য নতুন নীতিমালা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
কোন ধরনের উত্তরপত্র পুনরায় পরীক্ষা করা হবে, কোন ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা বিবেচনায় নেওয়া হবে এবং পরীক্ষকদের যোগ্যতা ও জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয় নতুন নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের মান, আন্ডার মার্কিং বা ওভার মার্কিং হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
বর্তমান আইনে পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্রে অতিরিক্ত বা কম নম্বর দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে এ ধরনের অনিয়ম নির্ধারণে তৃতীয় একজন পরীক্ষকের মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়।
শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মতে, উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ চালু করা তাৎক্ষণিকভাবে কিছু সমস্যার সমাধান করতে পারে। তবে এটিকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. আব্দুস সালামের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তাত্ত্বিক পরীক্ষা-নির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত সক্ষমতার যথাযথ মূল্যায়ন সবসময় সম্ভব হয় না।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ