
বাংলাদেশি চিকিৎসক ও গবেষক ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাসান চৌধুরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেটের ই-ক্লিনিক্যাল মেডিসিনে। গবেষণাটির বিষয় সেপসিস আক্রান্ত রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময়কাল কমানো এবং এ ক্ষেত্রে রক্তের প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষার ভূমিকা।
সেপসিস হলো গুরুতর সংক্রমণের কারণে শরীরে তৈরি হওয়া এমন একটি তীব্র প্রতিক্রিয়া, যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে এবং এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এ ধরনের রোগীদের অনেক সময় দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। কিন্তু অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্স বা ওষুধপ্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি বাড়ে।
এই সমস্যার সমাধানে গবেষকরা দেখেছেন, রক্তে প্রোক্যালসিটোনিন নামের একটি মার্কারের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করে অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কি না।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০২৩–২৪ সালে সেপসিস বা সম্ভাব্য সেপসিসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্য থেকে গবেষণার নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী ৫৩২ জনকে নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। রোগীদের দৈবচয়নের মাধ্যমে দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল।
একটি দল প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে চিকিৎসা পেয়েছে। এই দলের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মধ্যম সময় ছিল ৯ দিন। অন্য দলের ক্ষেত্রে রক্তে প্রোক্যালসিটোনিনের মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই দলের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মধ্যম সময় কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪.৭ দিন—অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুই দলের মধ্যে মৃত্যুহার বা আবার সংক্রমিত হওয়ার হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষাকে অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধের সিদ্ধান্তে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে গবেষণাটি ইঙ্গিত করছে।
এর সম্ভাব্য সুফল বাংলাদেশের জন্য বড় হতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি কমতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের সরাসরি খরচও কমতে পারে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। গবেষণায় প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষার খরচ যোগ করার পর মোট চিকিৎসা ব্যয় প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় বেশি ছিল। তাই শুধু এই গবেষণার ভিত্তিতে বলা যাবে না যে পদ্ধতিটি সামগ্রিকভাবে বেশি সাশ্রয়ী। বাংলাদেশে এটি ব্যাপকভাবে চালু করতে হলে কম খরচে পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং পূর্ণাঙ্গ ব্যয়সাশ্রয়ী মূল্যায়ন প্রয়োজন।
আরেকটি বড় অর্জন হলো, বাংলাদেশের রোগীদের নিয়ে করা এই গবেষণা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকাশিত হয়েছে। এটি দেখায়, বাংলাদেশ শুধু আন্তর্জাতিক গবেষণার জন্য রোগীর তথ্য বা নমুনা দেওয়ার দেশ নয়; বরং দেশের নিজস্ব স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিক্যাল প্রমাণও তৈরি করতে পারে।
নীতিনির্ধারকেরা উদ্যোগ নিলে ভবিষ্যতে দেশের হাসপাতালগুলোতে সহজলভ্য ও কম খরচের প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষার ব্যবস্থা করা সম্ভব হতে পারে। আর সেটি সফল হলে সেপসিস রোগীদের অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা কমানো, চিকিৎসার জটিলতা নিয়ন্ত্রণ এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য নতুন একটি পথ তৈরি হতে পারে।
তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো সেপসিস রোগীর অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করা উচিত নয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি