
দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান না করা এবং জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা বাড়ার কারণে দেশে যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার একাধিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বিগত সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ না দেওয়ায় দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় এগোয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পাঁচটি প্রধান কর্মপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে—দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সাইসমিক জরিপ পরিচালনা, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা, নতুন পিএসসি ও বিডিং কার্যক্রম এবং LNG অবকাঠামো সম্প্রসারণ।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি কূপের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। চলমান আরও সাতটি কূপের কাজ শেষ হলে অতিরিক্ত প্রায় ৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
একই সঙ্গে নতুন গ্যাসের উৎস খুঁজে বের করতে বড় পরিসরে সাইসমিক জরিপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর আওতায় ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। অনশোরের পাশাপাশি অফশোর এলাকাতেও গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাপেক্সকে শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে নতুন দুটি রিগ কেনার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয়ভাবে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে LNG আমদানির ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
অন্যদিকে, দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পূরণে LNG অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় নতুন ভাসমান LNG টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, টার্মিনালটি চালু হলে LNG আমদানির সক্ষমতা আরও বাড়বে। পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় আরও ভাসমান LNG টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শুধু গ্যাস ও LNG-এর ওপর নির্ভর না করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রুফটপ সোলার ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার জন্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জামের ওপর শুল্ক ও কর সুবিধা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় কয়লা ব্যবহার সম্ভাব্য একটি বিকল্প হতে পারে। তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হলে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও মানুষের জীবিকার ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে পুনর্বাসন এবং পরিবেশগত বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার একদিকে দেশীয় গ্যাস ও কয়লা অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে LNG আমদানি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতাও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবে কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন কতটা বাড়ানো সম্ভব হয়—তার ওপরই ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা ও জ্বালানি নিরাপত্তার বড় অংশ নির্ভর করবে।