
মেঘনা সেতু পার হয়েই চোখে পড়ে এক বিশৃঙ্খল দৃশ্য, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দূরপাল্লার ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান আর বাসের ফাঁকে গুঁজে আছে ছোট ছোট তিন চাকার বাহন। একপাশে ছুটছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, অন্য পাশে ব্যাটারিচালিত রিকশা, মিশুক আর লেগুনা। যেন এক দৌড় প্রতিযোগিতা চলছে- আইনের সঙ্গে নয়, জীবিকার সঙ্গে। এই দৃশ্য এখন প্রতিদিনের, যেন নিয়মই হয়ে গেছে এই বিশৃঙ্খলা।
মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) দুপুরের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় রোডের মোড়ে দাঁড়িয়ে দেখা গেল, ব্যস্ততম এই সড়কে মুহূর্তেই থেমে যাচ্ছে যান চলাচল। হঠাৎ এক অটোরিকশা মাঝরাস্তায় যাত্রী তুলতে থেমেছে, পিছন থেকে ছুটে আসা কাভার্ড ভ্যানটি হঠাৎ ব্রেক কষে থেমে গেল। যাত্রীদের আতঙ্ক, চালকের মুখে বিরক্তি। মিনিট না পেরোতেই আবার একই দৃশ্য যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এই বিশৃঙ্খলা।
মেঘনা সেতু থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার জুড়ে ছোট যানবাহনের চলাচল এখন নিয়মিত। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কেউ মূল লেনে যাত্রী নামাচ্ছে, কেউ আবার উল্টো পথে ছুটছে দ্রুত ফেরার আশায়। এর ফলে প্রায়ই দেখা দেয় যানজট, ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটে নিত্যদিন।
এক যাত্রী জানালেন, বড় বাসটা ঠিকমতো চলছিল, হঠাৎ এক ব্যাটারিচালিত রিকশা লেন বদল করে সামনে চলে আসে। চালককে জোরে ব্রেক ধরতে হলো, সবাই ভয় পেয়ে গেল। ভাগ্য ভালো, আজ কিছু হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অটোরিকশা চালক বলেন, আমরা জানি এই রাস্তায় আমাদের গাড়ি চালানো নিষেধ। কিন্তু পেট তো থেমে থাকে না ভাই। প্রতিদিন একটু ঝুঁকি নিয়েই নামি রাস্তায়। কখনো পুলিশ ধরলে ম্যানেজ করতে হয়, না হলে আমাদের গাড়ি রাস্তায় নামানোই যায় না।
পরিবার নিয়ে যাতায়াত করা এক যাত্রী বলেন, প্রতিবারই মনে হয় আজ না জানি কোন দুর্ঘটনার মুখে পড়ি। শিশু-বৃদ্ধ নিয়ে যাতায়াত করা এখন ভয়ংকর। মহাসড়ক এখন যেন বাজারে পরিণত হয়েছে। যার যখন ইচ্ছা গাড়ি থামায়, যাত্রী তোলে -ফলে সময়ও নষ্ট হয়, নিরাপত্তাও থাকে না।
মেঘনা শিল্পাঞ্চলের এক শ্রমিক বলেন, আমরা প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করি। ভয় হয়- আজ না জানি কার গায়ে লাগবে, কে মারা যাবে!
যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, আইনের কাগজে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও নেই। একদিকে জীবিকার তাগিদে চালকরা আইন ভাঙতে বাধ্য হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রশাসনের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। ফলে মহাসড়ক এখন পরিণত হয়েছে এক ঝুঁকির রাজপথে যেখানে জীবিকা আর জীবনের মধ্যে প্রতিনিয়ত চলছে অদৃশ্য এক যুদ্ধ।তাদের দাবি, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসনের কঠোর তদারকি প্রয়োজন, নইলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা যেকোনো সময় ঘটতে পারে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে সরকার দেশের ২২টি মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়, দেশের সব প্রধান মহাসড়কে এসব যানবাহনের চলাচল বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু কাগজের সেই নির্দেশ বাস্তবে যেন ধুলোয় মিশে গেছে। প্রতিদিনই হাইওয়ে পুলিশের চোখের সামনেই চলছে ছোট যানবাহনের অবাধ চলাচল।
হাইওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে সোনারগাঁ অংশে ছোট যানবাহনের কারণে অন্তত এক ডজন ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে প্রাণহানিও ঘটেছে।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কাদির জিলানি জানান, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশের সব জায়গাতেই থ্রি-হুইলার চলছে। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। প্রতি মাসে ১০০ থেকে ১৫০টি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছি। পাশাপাশি মাইকিং করে চালক ও যাত্রীদের সচেতন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন,এই এলাকায় অসংখ্য সংযোগ সড়ক রয়েছে, কারণ এটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন। ফলে ছোট যানবাহনগুলো মুহূর্তে মহাসড়কে উঠে আসে। আমাদের জনবলও তুলনামূলক কম, তাই সবসময় সব পয়েন্টে নজর রাখা সম্ভব হয় না। এই বিষয়ে জনগণকেও সচেতন হতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা রহমানের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ